ফুটবল মাঠের জাদুকর লিওনেল মেসিকে চেনেন না বা তাঁর খেলা ভালোবাসেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। নিজের দীর্ঘ এবং বর্ণিল ক্যারিয়ারে অসংখ্য ট্রফি, গোল আর রেকর্ড নিজের নামে করেছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। ফুটবল ইতিহাসের প্রায় সব বড় বড় রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দেওয়া মেসি এবার আন্তর্জাতিক ফুটবলে এক নতুন রেকর্ড গড়লেন। তবে এই রেকর্ডটি কোনো আনন্দের বা গর্বের নয়, বরং ক্যারিয়ারের অন্যতম এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও লজ্জার রেকর্ড এটি। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক একক বিশ্বকাপ আসরে দুটি পেনাল্টি মিস করার রেকর্ড নিজের করে নিলেন তিনি। বিখ্যাত ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন (ESPN) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মিশরের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস ও মেসির ব্যর্থতা
চলমান ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আসরে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও মিশর। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) অনুষ্ঠিত হওয়া এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে ফুটবলপ্রেমীরা আবার দেখল মেসির পেনাল্টি মিসের সেই চেনা দৃশ্য। ম্যাচের শুরু থেকেই টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। খেলার ঠিক ২১তম মিনিটে একটি ফাউলকে কেন্দ্র করে পেনাল্টি পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। পুরো স্টেডিয়াম তখন উল্লাসে ফেটে পড়ে, কারণ স্পটকিক নিতে পেনাল্টি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন স্বয়ং লিওনেল মেসি।
সবাই যখন ধরেই নিয়েছিল আর্জেন্টিনার গোল হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র, তখনই ঘটল অঘটন। মেসি তাঁর চেনা বাঁ পায়ের শটটি মিশরের গোলরক্ষকের বাম দিক দিয়ে জালের কোণায় পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শটটিতে পর্যাপ্ত শক্তি বা সঠিক কোণ (Angle) ছিল না। ফলে মিশরের দক্ষ গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর দুর্দান্ত এক ডাইভ দিয়ে মেসির সেই শটটি আটকে দেন। গোল করতে ব্যর্থ হন মেসি, আর আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা স্তব্ধ হয়ে যান। ম্যাচের ধারাভাষ্যকাররাও মন্তব্য করেন যে, নিজের এত দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মেসিকে এতটা আত্মবিশ্বাসহীন এবং দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে খুব কম সময়ই দেখা গেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে জোড়া পেনাল্টি মিসের ইতিহাস
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে একটি পেনাল্টি মিস করাই যেকোনো ফুটবলারের জন্য অনেক বড় মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর মেসি এই চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপ আসরে এক দুবার নয়, দু-দুবার পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হলেন। মিশরের বিপক্ষে ম্যাচের আগে গ্রুপপর্বের খেলায় অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধেও একটি পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে সেই প্রথম পেনাল্টি মিসের পর মিশরের বিরুদ্ধে এই দ্বিতীয় মিসটি মেসিকে এনে দিল ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে এক বিশ্বকাপে ২ পেনাল্টি মিস করার এই অপ্রত্যাশিত রেকর্ড। এর আগে ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে কোনো একক টুর্নামেন্টে কোনো ফুটবলার দুবার পেনাল্টি শট মিস করেননি।
বিশ্বকাপে পেনাল্টি নেওয়ার সর্বোচ্চ রেকর্ড ও ব্যর্থতার পরিসংখ্যান
লিওনেল মেসি তাঁর ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে বহু ম্যাচ খেলেছেন। স্বাভাবিকভাবেই দলের প্রধান পেনাল্টি টেকার বা শটার হিসেবে তিনিই শট নিয়ে থাকেন। বিশ্বকাপে সর্বমোট ৮ বার পেনাল্টি শট নিয়েছেন মেসি, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের যেকোনো ফুটবলারের মধ্যে সর্বোচ্চ শট নেওয়ার রেকর্ড।
কিন্তু এই সর্বোচ্চ শট নেওয়ার রেকর্ডের পাশাপাশি তাঁর মিসের খতিয়ানও বেশ দীর্ঘ হয়ে গেছে। এই ৮টি পেনাল্টির মধ্যে ৪ বারই বল প্রতিপক্ষের জালে জড়াতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, বিশ্বকাপে তাঁর নেওয়া পেনাল্টির ৫০ শতাংশ বা অর্ধেকই গোল হয়নি। মেসির এই পেনাল্টি মিসের ইতিহাস কিন্তু নতুন নয়, এর আগেও বড় বড় ম্যাচে তিনি পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি:
- ২০১৮ বিশ্বকাপ: আইসল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের ম্যাচে পেনাল্টি মিস করেছিলেন।
- ২০২২ বিশ্বকাপ: পোল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচেও পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন।
- ২০২৬ বিশ্বকাপ: অস্ট্রিয়া এবং মিশরের বিপক্ষে দুটি পেনাল্টি মিস করেন।
আসামোয়াহ জিয়ানকে ছাড়িয়ে শীর্ষে মেসি
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি মিস করার রেকর্ডটি ছিল ঘানার তারকা ফুটবলার আসামোয়াহ জিয়ানের। তিনি বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পেনাল্টি মিস করেছিলেন। কিন্তু চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে যখন মেসি প্রথম পেনাল্টিটি মিস করেন, তখনই তিনি আসামোয়াহ জিয়ানকে টপকে যান। আর মিশরের বিপক্ষে দ্বিতীয় পেনাল্টি মিসের মাধ্যমে তিনি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেলেন, যা কোনো ফুটবলারই হয়তো নিজের ক্যারিয়ারে চাবেন না।
পেনাল্টিতে কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন মেসি?
লিওনেল মেসি যেখানে ডি-বক্সের বাইরে থেকে ফ্রি-কিকে চোখ ধাঁধানো সব গোল নিয়মিত করে থাকেন, সেখানে মাত্র ১১ মিটার দূর থেকে পেনাল্টি স্পট থেকে গোল করতে কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন—এই প্রশ্ন এখন কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের মনে। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, পেনাল্টি সম্পূর্ণ একটি মনস্তাত্ত্বিক বা মানসিক খেলা। অতিরিক্ত চাপ, গোলরক্ষকের মনস্তত্ত্ব বুঝতে না পারা এবং সাম্প্রতিক সময়ে পেনাল্টি নেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মন্থর গতি বা ডেসিশন চেঞ্জ করার প্রবণতাই মেসির এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হতে পারে।
তাছাড়া, বর্তমান যুগের গোলরক্ষকেরা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পেনাল্টি শুটারদের পুরোনো শট নেওয়ার ধরণ ও কৌশল আগে থেকেই নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে মাঠে নামেন। মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইরের ক্ষেত্রেও তেমনটিই ঘটেছে। তিনি মেসির শটের দিক আগে থেকেই অনুমান করতে পেরেছিলেন।
রেকর্ড ভালো হোক কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত, লিওনেল মেসি ফুটবল বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা বা ‘গোট’ (GOAT)। তাঁর এই পেনাল্টি মিসের রেকর্ড হয়তো সাময়িকভাবে সমালোচকদের কথা বলার সুযোগ করে দেবে, কিন্তু ফুটবল খেলায় তাঁর অবদান এবং শ্রেষ্ঠত্বকে কোনোভাবেই ছোট করতে পারবে না। ২০২৬ বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলোতে মেসি এই মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠে আবার নিজের সেরা ফর্মে ফিরবেন এবং আর্জেন্টিনাকে জয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন—এমনটাই প্রত্যাশা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের।








