জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল হাতে পেয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। প্রিপেইড মিটার হোক কিংবা পোস্টপেইড—সবখানেই বিল এসেছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান, সবখানেই এখন আলোচনার মূল বিষয় ‘বিদ্যুৎ বিলের ভুতুড়ে কাণ্ড’। গ্রাহকদের এই তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখে অবশেষে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছে দেশের বিদ্যুৎ বিভাগ।
সোমবার বিদ্যুৎ ভবনে দেশের চলমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশেষ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। সেখানে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে গ্রাহকদের অতিরিক্ত বিল আসার মূল কারণগুলো ব্যাখ্যা করেন। বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, বিল বাড়ার পেছনে মিটারের কোনো ত্রুটি নেই। মূলত নতুন নিয়ম, অতিরিক্ত গরম এবং গ্রাহকদের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করেই এই বিল বেড়েছে।
বিল বাড়ার মূল ৩টি কারণ কী কী?
বিদ্যুৎ সচিব তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, মিটার নষ্ট থাকার কারণে বিল বেশি আসছে না। এর পেছনে প্রধানত তিনটি বড় কারণ রয়েছে। কারণগুলো নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো:
১. নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফ বা দাম বৃদ্ধি
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জুন মাস থেকে বিদ্যুতের নতুন দাম বা ট্যারিফ কার্যকর করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকরা আগের সমপরিমাণ টাকা রিচার্জ করেও আগের চেয়ে কম ইউনিট পাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, আগে ১০০০ টাকা রিচার্জ করে যে পরিমাণ ইউনিট পাওয়া যেত, জুনে এসে তার চেয়ে কম ইউনিট পাওয়া যাচ্ছে। এই কারণে গ্রাহকদের বারবার রিচার্জ করতে হচ্ছে, যা অনেকের কাছে ‘অস্বাভাবিক টাকা কেটে নেওয়া’ বলে মনে হচ্ছে।
২. তীব্র গরম ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার
জুন মাসে দেশজুড়ে তীব্র গরম ছিল এবং বৃষ্টিপাত ছিল অনেক কম। গরম থেকে বাঁচতে প্রতিটি পরিবারেই ফ্যান, এসি ও এয়ার কুলারের ব্যবহার অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এর পাশাপাশি জুন মাসেই অনুষ্ঠিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা, ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ এবং এসএসসি পরীক্ষা। এই বড় বড় উৎসব ও পরীক্ষার কারণে বাসাবাড়িতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি চালানো হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, বাড়তি ব্যবহারের কারণেই বিলের পরিমাণও লাফিয়ে বেড়েছে।
৩. উচ্চ স্ল্যাবে (Slab) প্রবেশ করা
আমাদের দেশে বিদ্যুৎ বিলের একটি নিয়ম রয়েছে আপনি যত বেশি ইউনিট ব্যবহার করবেন, প্রতি ইউনিটের দাম তত বাড়বে। একে বলা হয় ‘ট্যারিফ স্ল্যাব’। জুন মাসে অতিরিক্ত গরমের কারণে গ্রাহকরা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন। ফলে অনেকেই তাদের নিয়মিত ব্যবহারের সীমা পার করে উচ্চতর স্ল্যাবে চলে গেছেন। আর উচ্চ স্ল্যাবে যাওয়ার কারণেই তাদের বিলের পরিমাণ সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি এসেছে।
করণিক ভুল এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সংশোধন উদ্যোগ
সব দোষ যে শুধু গ্রাহকদের বা নিয়মের, তা কিন্তু নয়। বিদ্যুৎ বিভাগ স্বীকার করেছে যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিল তৈরির সময় মানুষের বা করণিক (Clerical) ভুল হয়েছে। টাইপিং বা হিসাবের ভুলের কারণে কিছু গ্রাহকের বিল অস্বাভাবিক এসেছে।
তবে এই বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ আশ্বস্ত করে বলেছে, যেসব বিলে এই ধরনের ভুল পাওয়া গেছে, সেগুলো আবার পরীক্ষা করা হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ভুল বিলগুলো সংশোধন করে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সুখবর
বিদ্যুৎ বিল বাড়লেও দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনা করেছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ‘লাইফলাইন’ গ্রাহক (যারা খুব কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন) এবং প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। তাদের জন্য আগের কম দামই বহাল রাখা হয়েছে।
এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি পুরোপুরি চালু রয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আরও উন্নতির জন্য এবং সিস্টেম লস (বিদ্যুৎ অপচয়) কমানোর জন্য স্মার্ট মিটারিং ব্যবস্থা আরও বাড়ানোর কাজ চলছে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়।
আপনার বিল নিয়ে সন্দেহ থাকলে কী করবেন?
যদি আপনার মনে হয় আপনার বিদ্যুৎ বিলটি সঠিক নয় বা মিটারে কোনো সমস্যা আছে, তবে আতঙ্কিত বা উগ্র হওয়ার কিছু নেই। বিদ্যুৎ বিভাগ গ্রাহকদের জন্য কিছু নির্দেশনা দিয়েছে:
- গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ: আপনার বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কোনো অভিযোগ বা সন্দেহ থাকলে সরাসরি আপনার এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে (Customer Care) যোগাযোগ করুন।
- মিটার পরীক্ষা ও পুনঃযাচাই: আপনার অভিযোগের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা আপনার মিটারটি ল্যাবে পরীক্ষা করবেন এবং বিলটি আবার হিসাব করে দেখবেন। যদি কোনো ভুল থাকে, তবে তা অবশ্যই ঠিক করে দেওয়া হবে।
মিটার ভাড়া ও গুজবের বিষয়ে সরকারের বার্তা
বর্তমানে প্রিপেইড মিটারের ভাড়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন ও ক্ষোভ রয়েছে। এই বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, সরকার মিটার ভাড়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং এটি নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই এই মিটার ভাড়ার বিষয়ে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেশবাসীকে জানানো হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ দেশের সাংবাদিক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের প্রতি একটি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে। তারা বলেছেন, বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত যেকোনো খবর প্রকাশের আগে যেন তথ্যের সত্যতা ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া হয়। কোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যে কান দিয়ে দেশের সরকারি সম্পদের বা বিদ্যুৎ স্থাপনার ক্ষতি না করার জন্য সাধারণ জনগণের প্রতি আকুল আবেদন জানানো হয়েছে।








