হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
শনিবার, জুলাই ৪, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়পিতা-মাতার ভরণপোষণ না করলে ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদণ্ড
spot_img

পিতা-মাতার ভরণপোষণ না করলে ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদণ্ড

আমাদের সমাজ ও পরিবারে পিতা-মাতার স্থান সবার ওপরে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক সন্তানই বিয়ের পর বা নিজের ক্যারিয়ারের তাগিদে বৃদ্ধ মা-বাবাকে ভুলে যান, এমনকি অনেককে বৃদ্ধাশ্রমেও পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই নির্মম বাস্তবতা থেকে প্রবীণদের সুরক্ষা দিতে এবং পারিবারিক মূল্যবোধ বজায় রাখতে বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত কঠোর আইন রয়েছে।

‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী, পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা প্রত্যেক ছেলে-মেয়েরই একটি বাধ্যতামূলক আইনগত দায়িত্ব। কোনো সন্তান এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে তাকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং তা অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

এই আইন অনুযায়ী, ‘পিতা’ বলতে সন্তানের আসল জনক এবং ‘মাতা’ বলতে সন্তানের গর্ভধারিণী মাকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘ভরণপোষণ’ বলতে শুধু টাকা-পয়সা দেওয়া নয়; বরং তাঁদের সঠিক খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, উন্নত চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত সময় বা সঙ্গ প্রদানকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আইনের ৩ ধারা: সন্তানের জন্য যেসব কাজ বাধ্যতামূলক

পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ এর ৩ ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তাঁর পিতা-মাতার দৈনন্দিন ভরণপোষণ শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। এই ধারার মূল বিষয়গুলো নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:

  • একাধিক সন্তানের দায়িত্ব: কোনো মা-বাবার একাধিক সন্তান থাকলে তারা নিজেরা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এই ভরণপোষণের দায়িত্ব বণ্টন বা পালন করবে।
  • একত্রে বসবাস: পিতা-মাতাকে সন্তানের একই স্থানে বা একই ছাদের নিচে বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো নিষিদ্ধ: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁদের কোনোভাবেই বৃদ্ধনিবাস বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা যাবে না।
  • খোঁজখবর ও চিকিৎসা: সন্তানকে নিয়মিত পিতা-মাতার স্বাস্থ্য ও মানসিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • আলাদা থাকলে মাসিক ভাতা: পিতা-মাতা যদি সন্তানের সাথে না থেকে আলাদাভাবে বসবাস করেন, তবে সন্তানের দৈনিক বা মাসিক আয় থেকে একটি যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত তাঁদের পাঠাতে হবে।

আইনের ৪ ধারা: দাদা-দাদী ও নানা-নানীর দায়িত্বও নাতি-নাতনির

এই আইনের পরিধি শুধু মা-বাবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি তিন প্রজন্মের বন্ধনকে সুরক্ষিত করেছে। আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, পিতার অনুপস্থিতিতে (বা পিতা জীবিত না থাকলে) দাদা-দাদী এবং মাতার অনুপস্থিতিতে নানা-নানীর ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নাতি-নাতনির ওপর বর্তাবে। এই দায়িত্ব পালন না করাও আইনত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আইনের ৫ ধারা: অপরাধের শাস্তি ও প্ররোচনাকারীর দণ্ড

আইনের ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সন্তান যদি ৩ বা ৪ ধারার কোনো বিধান লঙ্ঘন করে বা মা-বাবার দেখভাল না করে, তবে তা সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর জন্য তাকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং তা দিতে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ তিন মাসের জেলের সাজা ভোগ করতে হবে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, যদি সন্তানের বউ বা জামাই মা-বাবাকে দেখভাল করতে বাধা দেয়, তবে কী হবে? আইনের ৫(২) ধারায় এরও চমৎকার সমাধান দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনো সন্তানের স্ত্রী, স্বামী, পুত্র-কন্যা বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি পিতা-মাতা, দাদা-দাদী বা নানা-নানীর ভরণপোষণে বাধা দেন বা অসহযোগিতা করেন, তবে তাকেও অপরাধের সমান অংশীদার বা সহায়তাকারী হিসেবে একই দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

আইনটি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর মূল্যায়ন

‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ বাংলাদেশের পারিবারিক বন্ধন ও প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন।

তিনি এই আইনের কয়েকটি পজিটিভ দিক উল্লেখ করে বলেন:

১. পারিবারিক সুরক্ষার আইনি গ্যারান্টি: ৩ ধারায় মা-বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো নিষিদ্ধ করে পারিবারিক বন্ধনকে একটি শক্ত আইনি প্রটেকশন দেওয়া হয়েছে।

২. কঠোর বার্তা: ৫ ধারার ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান দায়িত্বহীন সন্তানদের জন্য রাষ্ট্র ও আইনের পক্ষ থেকে একটি কঠোর ও স্পষ্ট আইনি বার্তা।

৩. আপোষ-মীমাংসার সুযোগ: আইনের ৮ ধারায় আদালতের বাইরে স্থানীয়ভাবে আপোষ-মীমাংসার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির সাথে একদম সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৪. নতুন আশার আলো: ২০২৩ সালের নতুন বিধিমালায় সরকারিভাবে ‘ভরণ-পোষণ তহবিল’ ও ‘পরিচর্যাকেন্দ্র’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যা অসহায় প্রবীণদের জন্য নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন পরিশেষে বলেন, “এই আইনটি শুধু সন্তানদের শাস্তি দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়নি, বরং সন্তানদের তাঁদের পবিত্র দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে।”


আইনটি সম্পর্কে সমাজে যত বেশি সচেতনতা বাড়বে, আমাদের পারিবারিক সম্প্রীতি তত বেশি দৃঢ় হবে এবং কোনো প্রবীণ মা-বাবাকে জীবনের শেষ বয়সে এসে অবহেলা বা জরাজীর্ণ অবস্থায় দিন কাটাতে হবে না। মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের কমেন্ট বক্সে লিখে জানান। দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ আইন ও সামাজিক সচেতনতামূলক খবর সবার আগে সহজ ভাষায় পড়তে আমাদের নিউজপেপার ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!