বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবার নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর দেশের বাইরে নির্বাসিত জীবনে থাকার পর, অবশেষে নিজের দেশে ফেরার বিষয়ে সবচেয়ে বড় ও চূড়ান্ত ঘোষণাটি দিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। সব ধরনের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, পর্দার পিছনের ষড়যন্ত্র এবং আইনি বাধা উপেক্ষা করে তিনি চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের মধ্যেই বাংলাদেশে ফিরে আসবেন বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন।
ভারতের বিখ্যাত ও প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘এনডিটিভি’ (NDTV)-কে দেওয়া এক বিশেষ ই-মেইল সাক্ষাৎকারে তিনি এই দৃঢ় প্রত্যয় ও রাজনৈতিক অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেন। শেখ হাসিনার এই আকস্মিক ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে নানা আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
কেন দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা?
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে দেশে ফেরা বা রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া তাঁর ব্যক্তিগত কোনো ক্ষমতা বা লোভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়। বরং এটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, দেশে পুনরায় গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করার লড়াইয়ের সাথে সরাসরি জড়িত।
বিশেষ বক্তব্য: শেখ হাসিনা বলেন, “আমি ক্ষমতার লোভ বা নিজের স্বার্থের জন্য রাজনীতি করি না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই আমার এই সংগ্রাম এবং আমৃত্যু এই লড়াই চলবে।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, তিনি মৃত্যুকে বিন্দুমাত্র ভয় পান না। অতীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস ট্র্যাজেডি এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো একাধিক প্রাণঘাতী ও কঠিন সময় তিনি খুব কাছ থেকে পার করেছেন। প্রতিবারই তিনি সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করে সাধারণ জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাই এবারও সমস্ত আইনি ও রাজনৈতিক বাধা অতিক্রম করে তিনি তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসবেন।
দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও মামলা নিয়ে কড়া জবাব
আওয়ামী লীগের ওপর নানা বিধিনিষেধ, নিষেধাজ্ঞা এবং দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া হাজার হাজার মামলা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বেশ শক্ত অবস্থান দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগ কোনো কাগুজে বা ভুঁইফোড় সংগঠন নয় যে চাইলে কেউ একে মুছে ফেলতে পারবে।
- ঐতিহাসিক ভিত্তি: শেখ হাসিনা মনে করিয়ে দেন যে, আওয়ামী লীগ হলো বাংলার মাটি, মানুষ ও ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি এদেশের জাতীয় পরিচয়ের সাথে মিশে আছে।
- ৭৭ বছরের ইতিহাস: গত ৭৭ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলটি বহুবার ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, সামরিক শাসন ও কঠিন সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই দলটির মূল শক্তি তথা সাধারণ জনগণের ওপর ভর করে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু দেশবিরোধী ও আন্তর্জাতিক কুচক্রী শক্তি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের একটি অংশকে ভুল বুঝিয়ে ও বিভ্রান্ত করে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। কিন্তু মানুষের মনের গভীর থেকে আওয়ামী লীগের আদর্শকে কোনো শক্তিই মুছে ফেলতে পারবে না। তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখনও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দলের সমর্থনে রাস্তায় নামছেন, যা আওয়ামী লীগের দ্রুত পুনরুত্থানের স্পষ্ট লক্ষণ।
৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাতের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, দেশের তিনটি মূল ভিত্তি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর সরাসরি আঘাত হানা হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাঁথার স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করা, জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’ নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টা এবং দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, এই ধরনের আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে একটি ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করা।
গোপন সমঝোতার গুঞ্জন সম্পূর্ণ নাকচ
দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছিল যে, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির সাথে পর্দার আড়ালে হয়তো আওয়ামী লীগের কোনো সমঝোতা বা ডিল চলছে। সাক্ষাৎকারে এই ধরনের সমস্ত গুঞ্জন ও তথ্যকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেন শেখ হাসিনা।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আওয়ামী লীগ কোনো দুর্বল দল নয় যে তাকে কারও রাজনৈতিক দয়া বা অনুকম্পা নিয়ে চলতে হবে। গণতন্ত্র এবং জনগণের পবিত্র ভোটাধিকার কোনো গোপন দর-কষাকষির বা টেবিল টকের বিষয় নয়; এগুলো এদেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার।”
মন পড়ে আছে বাংলাদেশে
সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষ অংশে নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বর্তমানে ভারতের মাটিতে অবস্থান করলেও তাঁর মন ও প্রাণ সবসময় বাংলাদেশেই পড়ে থাকে। টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর বাবার সমাধি এবং প্রিয় দেশবাসীর কথা ভেবে তিনি প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত অস্থিরতা ও ব্যাকুলতার মধ্য দিয়ে পার করছেন।








