দেশের ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট দূর করতে এবং ঘরবাড়িতে অবৈধভাবে জমিয়ে রাখা নগদ টাকা মূল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এক অভিনব প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে জাতীয় সংসদে। বাজারে প্রচলিত ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট সাময়িকভাবে বাতিল করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির সংসদ সদস্য ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি দেন। এই প্রস্তাবের পর থেকেই দেশের সচেতন নাগরিক এবং অর্থনৈতিক মহলে নতুন করে নানা আলোচনা ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে।
কেন ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব?
সংসদ সদস্য মাহবুব উদ্দিন খোকন বর্তমান ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের অনেক মানুষই ব্যাংকে টাকা রাখতে নিরাপদ বোধ করছেন না। ফলস্বরূপ, তারা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিজেদের বাসাবাড়িতে নগদ অর্থ বা ক্যাশ হিসেবে সংরক্ষণ করছেন।
এর পাশাপাশি, অতীতে যারা দেশ থেকে অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিংবা স্বৈরাচারী শাসনের সুবিধাভোগী ছিলেন, তাদের কাছেও এখনও বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা রয়ে গেছে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোতে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্যই তিনি বড় নোট দুটি সাময়িকভাবে বন্ধ করার পরামর্শ দেন।
নোট বাতিলের পর টাকা বৈধ করার নতুন সূত্র
সংসদে দেওয়া প্রস্তাবে মাহবুব উদ্দিন খোকন কেবল নোট বাতিলের কথাই বলেননি, বরং এই টাকা কীভাবে ব্যাংকে ফিরবে তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখাও দিয়েছেন। তার প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি নিচে আলোচনা করা হলো:
- দুই মাসের সময়সীমা: সরকার যদি ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল ঘোষণা করে, তবে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সেই টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ দুই মাস বা ৬০ দিন সময় দেওয়া যেতে পারে।
- ২৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা: যেসব অর্থ বা আয় মানুষের নিয়মিত আয়কর নথিতে (Tax রিটার্ন) নেই, অর্থাৎ যা অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা, সেগুলো ব্যাংকে জমা দেওয়ার সময় ২৫ শতাংশ ফ্ল্যাট ট্যাক্স বা কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
এই পরিকল্পনার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা
১. বাজেট ঘাটতি পূরণ: ২৫ শতাংশ কর আদায়ের মাধ্যমে সরকারের কোষাগারে বিশাল রাজস্ব জমা হবে, যা দেশের চলমান বাজেট ঘাটতি কমাতে বড় সাহায্য করবে।
২. তারল্য বৃদ্ধি: বাসাবাড়িতে অলস পড়ে থাকা কোটি কোটি টাকা ব্যাংকে ফেরত আসায় ব্যাংক খাতের নগদ টাকার সংকট দূর হবে।
৩. উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ: ব্যাংকগুলো সচল হলে দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পাবেন, যা নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী খাতে অর্থ ব্যবহারে গতি আনবে।
দেশে ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর তাগিদ
পেশায় আইনজীবী এই সংসদ সদস্য দেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়ে আরও কিছু কড়া মন্তব্য করেন। তিনি দেশে কার্যরত ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর পক্ষে নিজের মত দেন।
তার মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির আয়তনের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি। জনগণের আমানতের বা জমানো টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পুরো ব্যাংক খাতকে নতুন করে পুনর্গঠন করা জরুরি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কিছু ব্যাংকের অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছর জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে বারবার সেই ব্যাংকগুলোর ঘাটতি বা মূলধন পূরণ করতে হয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
অর্থ পাচার ও বেকারত্ব নিয়ে উদ্বেগ
টাকা পাচারকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে মাহবুব উদ্দিন বলেন, একবার দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার হয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন ও জটিল প্রক্রিয়া। তাই শুধু আইন তৈরি করলেই হবে না, দেশের ভেতরেই এমন একটি চমৎকার ও নিরাপদ আর্থিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে দেশের মানুষ বাইরে টাকা না পাঠিয়ে বাংলাদেশেই বিনিয়োগ করতে আস্থা পায়।
বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক বেকার যুবকের জন্য যদি দ্রুত কর্মসংস্থান বা চাকরির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না যায়, তবে সমাজে কোনোভাবেই স্থায়ী স্থিতিশীলতা আসবে না।
সংকটকালেই নতুন সম্ভাবনা
আলোচনার শেষ অংশে মাহবুব উদ্দিন খোকন কিছুটা ইতিবাচক সুর মিলিয়ে বলেন, একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য ঘাটতি বাজেট হওয়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়; পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেই এমন ঘাটতি বাজেট দেখা যায়। বর্তমান বিশ্ব ও দেশের কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে এই বাজেটকে সফল করতে হলে পুরো আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংস্কার এবং মেমোরি কমান্ডারদের মতো সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।








