জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন মানেই যুক্তি, তর্ক আর রাজনৈতিক নেতাদের কথার লড়াই। কিন্তু মাঝেমধ্যে এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হয়, যা সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। ঠিক তেমনই এক ঘটনা ঘটল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের সাধারণ আলোচনায়।
সরকার দলীয় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি যখন বিরোধী দলকে একের পর এক তোপ দাগছিলেন, ঠিক তখনই তার জন্য বরাদ্দ সময় শেষ হয়ে আসে। আর তখনই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এক চিমটি রসিকতা ও কড়া নির্দেশ মিলিয়ে তাকে বক্তব্য শেষ করার তাগিদ দেন। স্পিকারের এই মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ সাড়া ফেলেছে।
সংসদে ঠিক কী ঘটেছিল?
রোববার বিকেলে যথারীতি বসেছিল সংসদ অধিবেশন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আলোচনা চলছিলো। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি তার জোরালো বক্তব্য রাখছিলেন। তিনি যখন পুরো দমে বিরোধী দলের সমালোচনা করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই তার নির্ধারিত সময় ফুরিয়ে যায়।
সময় শেষ দেখে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মাইক হাতে নেন এবং নিলোফার চৌধুরী মনিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “২ মিনিটে শেষ করেন, বাকি কথা টকশোতে বলবেন।” স্পিকারের এই স্বভাবসুলভ ও চটজলদি মন্তব্যের পর সংসদ কক্ষে কিছুটা হাসির রোল পড়ে, তবে মনি তার বক্তব্য দ্রুত শেষ করার প্রস্তুতি নেন।
বিরোধী দলকে নিলোফার মনির কড়া সমালোচনা
তার বক্তব্যের শুরু থেকেই নিলোফার চৌধুরী মনি ছিলেন বেশ আক্রমণাত্মক। গত কয়েকদিনের বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা যেসব বক্তব্য দিয়েছিলেন, তার একটি একটি করে জবাব দিচ্ছিলেন তিনি। বিশেষ করে কওমি মাদরাসা এবং তরুণ সমাজ নিয়ে বিরোধী দলের অবস্থান নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
কওমি মাদরাসা ও বিএনপির রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য
বক্তব্যের শুরুতেই মনি বিরোধী দলের এক সংসদ সদস্যের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন,
“গত কয়েকদিন আগে বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্য বলেছেন, কওমি মাদরাসায় নাকি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। আমি তাকে স্পষ্ট করে বলতে চাই কওমি শব্দের অর্থ হলো গোষ্ঠী। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা কোনো একক ব্যক্তির স্বার্থে কাজ করে না।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতা তারেক রহমান সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এখানে কোনো ভেদাভেদ বা গোষ্ঠীস্বার্থের জায়গা নেই।
তরুণ প্রতিনিধি ও গণভোট বিতর্ক
নিলোফার চৌধুরী মনি সংসদে তরুণ সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে সংসদে তরুণদের আটজন প্রতিনিধি রয়েছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তারা তরুণদের মূল সমস্যা, কর্মসংস্থান বা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো কার্যকর কথা বলছেন না।
মনির মতে, ওই তরুণ প্রতিনিধিরা কেবল ‘গণভোট’ এর মতো রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মেতে আছেন, যা এই মুহূর্তে তরুণ সমাজের মূল দাবি বা প্রয়োজন নয়। তরুণদের নিয়ে কথা না বলে তারা শুধু রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন বলে তিনি দাবি করেন।
‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সন্তান’ বিতর্ক ও স্পিকারের হস্তক্ষেপ
বক্তব্যের এক পর্যায়ে নিলোফার চৌধুরী মনি সংসদে এক চরম বিতর্কিত ও সংবেদনশীল বিষয় তুলে ধরেন। তিনি নাম উল্লেখ না করে এক সংসদ সদস্যের দিকে আঙুল তুলে বলেন,
“একজন সংসদ সদস্য তার বাবা জীবিত থাকার পরও তাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বলে উল্লেখ করেছেন। সংসদ সদস্য হতে হলে যে সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা হতেই হবে এমন তো কোনো কথা নেই। জনগণের জন্য সততার সাথে কাজ করলেই হয়। কিন্তু তারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধার সন্তান দাবি করার জন্য এমন অসত্য বক্তব্য দিচ্ছেন।”
তিনি এই কথা বলার সাথে সাথেই সংসদে উত্তেজনা ছড়ায়। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
স্পিকারের ব্যাখ্যা: এটি ছিল ‘স্লিপ অব টাং’
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিলোফার চৌধুরী মনির এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানান যে, বিষয়টি নিয়ে আগেই সংসদে কথা হয়েছে। স্পিকার বলেন,
“ওই সংসদ সদস্য যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা ছিল একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল। তিনি নিজেও পরবর্তীতে তার এই ভুলটি স্বীকার করেছেন। এটি মূলত একটি ‘স্লিপ অব টাং’ বা মুখের ভুল ছিল। এর আগেও সংসদকে এই বিষয়ে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছে।”
স্পিকারের এই হস্তক্ষেপের পর বিষয়টি নিয়ে আর দীর্ঘ আলোচনা হয়নি এবং মনিকে তার বক্তব্য দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কেন এই ঘটনাটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে?
একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নিলোফার চৌধুরী মনি টকশোতে বেশ পরিচিত মুখ। তিনি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে গিয়ে দলের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন। স্পিকার সম্ভবত তার এই টকশোর অভ্যাসের দিকেই ইঙ্গিত করে রসিকতাটি করেছিলেন।
সংসদের ভেতরে এমন রসবোধের ঘটনা নতুন নয়, তবে বাজেট অধিবেশনের মতো গম্ভীর পরিবেশে স্পিকারের এমন মন্তব্য পুরো সংসদকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও হালকা করে দেয়। একই সাথে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সংসদের ভেতরের সময় কতটা মূল্যবান এবং প্রতিটি সেকেন্ড হিসাব করে কথা বলতে হয়।








