বাংলাদেশের রাস্তায় এখন মোটরসাইকেল বা বাইক একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বাহন। যাতায়াতের সহজ মাধ্যম হওয়ার পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষের জীবিকার উৎসও এটি। তবে সম্প্রতি মোটরসাইকেল মালিক ও চালকদের জন্য একটি বড় খবর সামনে এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোটরসাইকেল মালিকদের ওপর অগ্রিম আয়কর (AIT) আরোপ করার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।
এই খবরটি আসার পর থেকেই বাইক চালক ও সাধারণ মানুষের মনে নানামুখী কৌতূহল এবং উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সবার মনে একটাই প্রশ্ন করযোগ্য আয় না থাকলেও এই ট্যাক্স কীভাবে দেওয়া লাগবে? চলুন আজকের এই প্রতিবেদনে সহজ ভাষায় জেনে নিই এনবিআর-এর পরিকল্পনা ও কর আদায়ের সম্ভাব্য সব নিয়ম।
কেন এই অগ্রিম আয়কর বা এআইটি (AIT)?
সরকারের পক্ষ থেকে করের আওতা বা নেটওয়ার্ক বাড়ানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৯ লাখ। এই বিপুল সংখ্যক যানবাহনের একটি বড় অংশই এখনো কোনো আয়করের আওতায় নেই। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান এই চিন্তাকে ইতিবাচক এবং যৌক্তিক মনে করছেন। তার মতে, মানুষ যাতে দেশের রাজস্ব খাতে অবদান রাখতে পারে, সেজন্য বাইক মালিকদের করের আওতায় আনা দরকার। তবে এই করের হার অবশ্যই সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে বা যৌক্তিক হতে হবে।
যেভাবে আদায় করা হতে পারে এই অগ্রিম আয়কর
বর্তমানে মোটরসাইকেল মালিকদের প্রতি বছর ট্যাক্স টোকেন ফি দিতে হয় এবং মেয়াদ শেষে তা নবায়ন করতে হয়। তবে নতুন নিয়মে এই অগ্রিম আয়কর কীভাবে আদায় করা হবে, তা নিয়ে দুটি মূল পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে:
১. টিআইএন (TIN) নম্বরের মাধ্যমে
প্রথম পরিকল্পনা অনুযায়ী, করদাতার ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার বা টিন (TIN) নম্বরের বিপরীতে এই অগ্রিম আয়কর আদায় করা হতে পারে। এনবিআর কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, এর ফলে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী নিয়মতান্ত্রিক ট্যাক্স সিস্টেমের মধ্যে চলে আসবে।
২. ট্যাক্স টোকেন ফির সাথে (TIN ছাড়া)
যেহেতু দেশের অনেক বাইক মালিকের করযোগ্য আয় নেই, তাই তাদের অনেকেরই টিন নম্বরও নেই। এই জটিলতা এড়াতে বিকল্প একটি পদ্ধতিও ভাবা হচ্ছে। সেটি হলো, প্রতি বছর যেভাবে বিআরটিএ-র (BRTA) মাধ্যমে বার্ষিক ট্যাক্স টোকেন ফি জমা দেওয়া হয়, ঠিক তার সাথেই এই অগ্রিম আয়করের টাকা যোগ করে দেওয়া। এতে করে সাধারণ বাইক চালকদের আলাদা করে টিন নম্বর নেওয়ার বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হবে না।
কোন বাইকে কত টাকা কর?
বাজেট প্রণয়নের সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের সূত্র থেকে জানা গেছে, মোটরবাইকের ইঞ্জিন ক্ষমতা বা সিসি (CC) অনুযায়ী এই করের হার নির্ধারণ করার আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য তালিকাটি নিচে দেওয়া হলো:
| মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষমতা (CC) | সম্ভাব্য বার্ষিক অগ্রিম আয়কর (টাকা) |
| ১১০ সিসি (CC) পর্যন্ত | নতুন করের আওতামুক্ত থাকার সম্ভাবনা বেশি |
| ১১১ সিসি থেকে ১২৫ সিসি | সর্বনিম্ন ২,০০০ টাকা |
| ১২৬ সিসি থেকে ১৬৫ সিসি | ৫,০০০ টাকা |
| ১৬৫ সিসির বেশি | ১০,০০০ টাকা |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্যও ৫ হাজার থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত কর নির্ধারণের প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাইক মালিক ও চালকদের প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিবাদ
মোটরসাইকেলের ওপর এই নতুন কর আরোপের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে বাইক চালকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশেষ করে যারা রাইড শেয়ারিং (যেমন পাঠাও, উবার) করেন কিংবা পণ্য বা খাবার ডেলিভারি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তারা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
ইতোমধ্যেই ঢাকার আগারগাঁওয়ে এনবিআর (NBR) প্রধান কার্যালয়ের সামনে বাইক মালিক ও চালকরা মানববন্ধন এবং বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করেছেন। এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে তারা একটি স্মারকলিপিও জমা দিয়েছেন।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবিগুলো হলো:
- প্রতিবেশি দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এমনিতেই মোটরসাইকেলের দাম অনেক বেশি।
- মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য বাইক এখন শখের বস্তু নয়, বরং আয়ের একমাত্র উৎস।
- এই বাড়তি করের বোঝা সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকে গভীর সংকটে ফেলবে।
গুলশানের এক মোটরসাইকেল চালক শাহাবুদ্দিন বলেন, “আমরা নিয়মিত ট্যাক্স টোকেন ফি দিই। এখন আবার নতুন করে ট্যাক্স দেওয়া আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য অন্যায় হবে।” আরেক চালক রফিক উল্ল্যাহ জানান, যারা শখ করে দামি বাইক চালায় তাদের জন্য ট্যাক্স ঠিক আছে, কিন্তু যারা বাইক চালিয়ে সংসার চালায়, তাদের ওপর এই করের বোঝা চাপানো মোটেও উচিত হবে না।
আগামী জুন মাসে জাতীয় সংসদে নতুন অর্থ বছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী। তখনই চূড়ান্তভাবে জানা যাবে এই অগ্রিম আয়করের প্রস্তাবটি কীভাবে কার্যকর হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকার ও এনবিআর যেন এমন কোনো সিদ্ধান্ত না নেয় যা সাধারণ ও মেহনতি বাইক চালকদের আয়ের ওপর বড় আঘাত হানে।








