কুরবানি কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বা পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করার এক অনন্য ইবাদত। প্রতি বছর জিলহজ মাস এলে মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে কুরবানির প্রস্তুতি শুরু হয়। সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ একা, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শরিক হয়ে গরু বা মহিষ কুরবানি করেন।
তবে কুরবানির সময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা দেয় একটি ভাগে কি দুই বা তিনজন মিলে শরিক হওয়া জায়েজ? অর্থাৎ, গরুর এক-সপ্তমাংশে (৭ ভাগের ১ ভাগে) একাধিক ব্যক্তি অংশ নিলে কি কুরবানি আদায় হবে? ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য বিশুদ্ধ নিয়তের পাশাপাশি তা শরিয়তের বিধান অনুযায়ী হওয়াও জরুরি। এই বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের স্পষ্ট হুকুম নিচে তুলে ধরা হলো।
বড় পশুতে শরিক হওয়ার মূল বিধান
ইসলামি শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কেবল একজনের পক্ষ থেকেই কুরবানি করা সম্ভব। অন্যদিকে গরু, মহিষ ও উটের মতো বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি পৃথকভাবে শরিক হতে পারেন।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো প্রতিটি ভাগের অংশ যেন কমপক্ষে পূর্ণ এক-সপ্তমাংশ (১/৭) হয় এবং প্রতিটি ভাগ কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকেই হতে হবে।
হাদিসের স্পষ্ট দলিল
বড় পশুতে শরিকানার বিষয়টি নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট হাদিস রয়েছে। হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
“আমরা হুদায়বিয়ার বছরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে কুরবানি করেছি। তখন একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরুও সাতজনের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছি।” (সহিহ মুসলিম: ১৩১৮)
এই হাদিস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাতজন মানুষ শরিক হতে পারবেন, তবে প্রত্যেকের অংশ পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ হতে হবে।
এক ভাগে একাধিক ব্যক্তি শরিক হওয়া কেন বৈধ নয়?
কুরবানি একটি নির্ধারিত সীমার আর্থিক ইবাদত। শরিয়ত বড় পশুর এক-সপ্তমাংশকে একজন ব্যক্তির জন্য ন্যূনতম অংশ বা কোটা হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এখন যদি দুই বা তিনজন ব্যক্তি মিলে সেই একটি ভাগের টাকা ভাগাভাগি করে নেন, তাহলে প্রত্যেকের অংশ এক-সপ্তমাংশের চেয়ে কম হয়ে যায়।
এ অবস্থায় শরিয়তের মূল শর্তটি আর পূরণ হয় না। ফকিহ তথা ইসলামি আইনবিদদের মতে, যদি কোনো একজন শরিকের অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হয়, তবে সেই পশুর কোনো শরিকেরই কুরবানি সহিহ হবে না। অর্থাৎ, একজনের ভুলের কারণে পুরো পশুর কুরবানিটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কারণ, প্রতিটি অংশে স্বতন্ত্র মালিকানা থাকা আবশ্যক।
ফিকহবিদদের নির্ভরযোগ্য মতামত
- হানাফি মাজহাব: নির্ভরযোগ্য ফতোয়ার কিতাবে বলা হয়েছে “গরু বা উটের প্রতিটি ভাগে একাধিক ব্যক্তির শরিক হওয়া বৈধ নয়। যদি কোনো শরিকের অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হয়, তবে কোনো শরিকেরই কুরবানি সহিহ হবে না।” (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮, ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া ৫/৩০৪)
- হাম্বলি মাজহাব: বিশিষ্ট ফকিহ ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন— “এক পশুতে সাতজনের বেশি শরিক হলে কুরবানি সহিহ হবে না।” (আল-মুগনি ১৩/৩৯০)
আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলে শরিয়তসম্মত সমাধান কী?
বাস্তব জীবনে অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারের দুই-তিনজন সদস্য বা ভাই মিলে একটি ভাগের টাকা জোগাড় করেন। কিন্তু সরাসরি যৌথ নামে এক ভাগ নেওয়া তো শরিয়তে জায়েজ নেই। তাহলে উপায় কী? এক্ষেত্রে শরিয়তসম্মত একটি সুন্দর ও সহজ সমাধান রয়েছে:
ধরা যাক, তিন ভাই মিলে একটি ভাগের টাকা সংগ্রহ করেছেন। সেক্ষেত্রে তারা সেই পুরো অর্থ যেকোনো একজন ভাইকে ‘হেবা’ বা উপহার হিসেবে দিয়ে দিতে পারেন। এরপর ওই ভাই নিজের নামে পূর্ণ এক ভাগে শরিক হবেন। এতে অন্তত একজনের কুরবানি সহিহভাবে আদায় হবে এবং বাকিরা তাকে সহযোগিতা করার কারণে সওয়াব পাবেন। কুরবানি শেষে তারা সবাই মিলে গোশত নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারবেন। (খুলাসাতুল ফতোয়া ৪/৩১৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৬)
কুরবানির শরিকানা নিয়ে একনজরে জরুরি কয়েকটি কথা
- বড় পশুর প্রতিটি ভাগ কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামেই হতে হবে।
- এক ভাগে দুই বা তার বেশি ব্যক্তি যৌথভাবে মালিক হলে কারও কুরবানিই সহিহ হবে না।
- একটি বড় পশুতে কোনোভাবেই সাতজনের বেশি শরিক করা যাবে না (সাতজনের কম যেকোনো সংখ্যা যেমন– ৫, ৩ বা ২ জন হতে পারবে)।
- শরিয়তের নিয়ম নিখুঁতভাবে মেনে কুরবানি করাই ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।
কুরবানি শুধু সামাজিক কোনো উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আল্লাহর নির্দেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। তাই এই ইবাদত আদায়ের ক্ষেত্রে আবেগ বা প্রচলিত লোকনিন্দার ভয় না করে, শরিয়তের সঠিক নিয়ম অনুসরণ করাই একজন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। ভুল নিয়মে শরিক হওয়ার কারণে যদি কুরবানিই সহিহ না হয়, তাহলে ত্যাগের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। তাই কুরবানির আগে সঠিক মাসআলা জেনে নেওয়া এবং বিশুদ্ধ নিয়তে ইবাদত করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক মাসআলা মেনে আন্তরিকতার সাথে কুরবানি আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।








