সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নজিরবিহীন হারে স্বর্ণের মজুত বাড়িয়ে চলেছে। চলতি বছরে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম প্রতি ট্রয় আউন্স ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে ইতিহাস গড়েছে। গত দেড় বছরে এই মূল্যবান ধাতুর দাম প্রায় দ্বিগুণ হলেও কেন দেশগুলো চড়া দামে সোনা কিনছে, তা নিয়ে কৌতূহল বাড়ছে।
মূলত ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন স্বর্ণকে ‘নিরাপদ সম্পদ’ হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
কোন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ কিনছে
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে। বর্তমানে স্বর্ণের বাজারে সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে:
- চীন ও ভারত: এশিয়ার এই দুই জায়ান্ট দেশ নিয়মিত তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে।
- পোল্যান্ড ও তুরস্ক: ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলোও তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনতে সোনা কিনছে।
- চেক প্রজাতন্ত্র ও উজবেকিস্তান: ছোট দেশগুলোও এখন দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার কথা ভাবছে।
কেন স্বর্ণের দিকে এই ঝোঁক
বিশেষজ্ঞরা স্বর্ণের প্রতি এই বাড়তি আগ্রহের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধ
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। যখনই বিশ্বে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন বিনিয়োগকারীরা ডলার বা ইউরোর চেয়ে স্বর্ণকে বেশি নিরাপদ মনে করেন। কারণ স্বর্ণের মান কোনো নির্দিষ্ট দেশের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না।
২. ডলারের বিকল্প এবং ‘নিষেধাজ্ঞা’ থেকে বাঁচা
২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বৈদেশিক রিজার্ভ জব্দ করে। এই ঘটনা অনেক দেশের চোখ খুলে দিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে, কেবল ডলার বা ইউরোর ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। স্বর্ণ এমন এক সম্পদ যা অন্য কোনো দেশ সহজে জব্দ বা এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে না।
৩. মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলা
জ্বালানি তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে মুদ্রার মান কমতে থাকে। মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে স্বর্ণকে মূল্য সংরক্ষণের সেরা মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। প্রয়োজনের সময় স্বর্ণ দ্রুত নগদে রূপান্তর করা যায়, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
স্বর্ণের মজুত বাড়ার প্রভাব
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, টানা তিন বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে ১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি স্বর্ণ কিনছে। এটি আগে কখনও দেখা যায়নি। উদাহরণস্বরূপ, তুরস্ক তাদের মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখতে সংকটের সময় রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ব্যবহার করেছে। পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অ্যাডাম গ্লাপিনস্কি জানিয়েছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতায় স্বর্ণের গুরুত্ব বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কেন সোনা
স্বর্ণ থেকে সরাসরি কোনো সুদ বা আয় আসে না এবং এটি সংরক্ষণে লজিস্টিক জটিলতা রয়েছে। তবুও এটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং অন্য কোনো দেশের দায় নয়। ফলে দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে স্বর্ণের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও আর্থিক ঝুঁকির এই সময়ে স্বর্ণ আবারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে স্বর্ণের এই চাহিদা আরও বাড়তে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করবে।








