বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর হঠাৎ মূল্যবান এই ধাতুর বাজারে মন্দাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শুক্রবার (১ মে) মাত্র এক দিনের ব্যবধানে স্বর্ণের দাম ১ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এতে সাধারণ ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপা, প্লাটিনাম এবং প্যালাডিয়ামের মতো অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও বিশ্ববাজারে হ্রাস পেয়েছে। মূলত বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন কিছু সমীকরণের কারণে স্বর্ণের এই দরপতন ঘটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বর্ণের দামে হঠাৎ এই পতনের মূল কারণ
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমার পেছনে বেশ কিছু অর্থনৈতিক কারণ কাজ করছে। যার মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:
১. জ্বালানি তেলের দাম ও মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা
বর্তমানে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেশ উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ে। এই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কঠোর অবস্থান নিতে পারে। যদি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না হয়, তবে ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারে। এই আশঙ্কার কারণেই স্বর্ণের বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।
২. সুদের হারের প্রভাব
স্বর্ণ হলো একটি সুদবিহীন বিনিয়োগ। অর্থাৎ, স্বর্ণ কিনে রাখলে সেখান থেকে সরাসরি কোনো সুদ পাওয়া যায় না। যখন বাজারে সুদের হার বেশি থাকে বা কমার সম্ভাবনা কম থাকে, তখন বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের বদলে ট্রেজারি বন্ডের মতো সুদবাহী সম্পদে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী হন। বর্তমান পরিস্থিতিতেও ঠিক তেমনটিই ঘটছে।
বিশ্ববাজারে বর্তমান স্বর্ণের দাম
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা ৫২ মিনিটে বিশ্ববাজারে স্পট গোল্ডের দাম ১.১ শতাংশ কমেছে। এর ফলে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫৬৮.৮২ ডলারে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে জুন মাসে সরবরাহের জন্য গোল্ড ফিউচারসের দামও ১.১ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৫৭৯.৭০ ডলারে নেমে এসেছে। এক দিনের ব্যবধানে এতোটা দরপতন সাম্প্রতিক সময়ে খুব একটা দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে তা স্বর্ণের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ এতে সুদের হারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। সাধারণত যখন ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বা মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়, তখন মানুষ স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করে। কিন্তু যখন ব্যাংকে সুদের হার বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন স্বর্ণের আকর্ষণ কিছুটা কমে যায়।
এর আগে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দিলেও, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তারা পুনরায় ভাবনায় পড়েছে। আর এই অনিশ্চয়তাই স্বর্ণের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
অন্যান্য ধাতুর বর্তমান পরিস্থিতি
স্বর্ণের দরপতনের প্রভাব পড়েছে রুপা এবং প্লাটিনামের বাজারেও। স্বর্ণের দাম যখন কমে, তখন সাধারণত অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও নিম্নমুখী থাকে। বিনিয়োগকারীরা এখন পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছেন এবং দেখছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পরবর্তীকালে কী পদক্ষেপ নেয়।
বিনিয়োগকারীদের জন্য টিপস
- বাজার পর্যবেক্ষণ করুন: স্বর্ণের বাজার বর্তমানে বেশ অস্থিতিশীল। তাই বড় বিনিয়োগের আগে বাজারের গতিবিধি লক্ষ্য করুন।
- দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করুন: স্বর্ণ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য ভালো। স্বল্পমেয়াদী ওঠানামায় আতঙ্কিত না হওয়াই ভালো।
- অর্থনৈতিক খবর রাখুন: বিশ্ববাজারের ডলারের মান এবং জ্বালানি তেলের দামের খবরের ওপর ভিত্তি করে স্বর্ণের দাম নির্ধারিত হয়, তাই এই বিষয়গুলোতে নজর রাখুন।
স্বর্ণের এই দরপতন সাধারণ ক্রেতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে এলেও বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি চিন্তার বিষয়। তবে বিশ্ববাজারের এই ধারা কতদিন বজায় থাকে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।








