ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল আলোচিত তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণকাজ নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধে বড় ধাক্কা খেল বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক সালিশি বোর্ডের রায়ে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে দীর্ঘদিনের পাওনা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই রায় ঘোষণা করা হয়। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত শুনানির পর আন্তর্জাতিক এই বোর্ড তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়।
কেন এই বিশাল জরিমানা
শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্ব পালন করছে ‘অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম’ (এডিসি)। এই কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপানের মিৎসুবিশি কর্পোরেশন, ফুজিতা কর্পোরেশন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি। নির্মাণকাজ চলাকালীন বিভিন্ন বিল এবং পাওনা নিয়ে বেবিচকের সাথে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরোধ তৈরি হয়।
এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির তিন অভিজ্ঞ বিচারকের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক সালিশি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। উভয়পক্ষের যুক্তি ও নথিপত্র বিচার-বিশ্লেষণ করে বোর্ড বাংলাদেশের বিপক্ষে এই রায় দেয়।
রায়ে কী বলা হয়েছে
আন্তর্জাতিক সালিশি বোর্ডের রায় অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু কাজের বিপরীতে (এপিসিএস-৪৮ এবং ৫২-৫৪) এডিসি-কে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিতে হবে। রায়ের হিসাব অনুযায়ী:
- জাপানি ইয়েন: ৫৮৯ কোটি ৮৬ লাখ ৯৯ হাজার ৭৩ ইয়েন।
- বাংলাদেশি টাকা: ২৭২ কোটি ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩৩১ টাকা।
এছাড়া কাজের নিরাপত্তা জামানত বা ‘রিটেনশন মানি’র দ্বিতীয় অংশ হিসেবে আরও বড় অংকের অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ৬০২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং ৪০০ কোটি ৪২ লাখ টাকার দুটি আলাদা ভাগ। সব মিলিয়ে এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ ও জনমনে প্রশ্ন
দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল অন্যতম। যেখানে এই টার্মিনালটি আধুনিকায়নের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল, সেখানে এত বড় অংকের জরিমানার খবর দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বিলম্বিত পেমেন্ট এবং রিটেনশন মানি আটকে রাখায় এই আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
বেবিচক সূত্র জানিয়েছে, তারা রায়ের কপি সংগ্রহ করেছে এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ বা আপিলের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করছে। তবে আন্তর্জাতিক সালিশি বোর্ডের রায় সাধারণত মানা বাধ্যতামূলক হওয়ায় এই বিশাল অর্থ পরিশোধ করা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে খুব বেশি পথ খোলা নেই।
একনজরে মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| মোট দেনা | প্রায় ১৬৫০ কোটি টাকা |
| দেশ | জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার এডিসি কনসোর্টিয়াম |
| বিচারক মণ্ডলী | মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির প্রতিনিধি |
| প্রকল্পের নাম | হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৩য় টার্মিনাল |
দেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে এমন আইনি জটিলতা এড়াতে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সঠিক সময়ে বিল পরিশোধ না করা এবং চুক্তি বাস্তবায়নে ধীরগতি এই বড় আর্থিক ক্ষতির মূল কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।








