পৌষের মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রকৃতি তার রুদ্র রূপ দেখাতে শুরু করেছে। হাড়কাঁপানো শীতে আক্ষরিক অর্থেই কাঁপছে গোপালগঞ্জ জেলা। গত কয়েকদিনের তুলনায় আজ বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) শীতের তীব্রতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গোপালগঞ্জে আজ দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা এই মৌসুমেরই সর্বনিম্ন।
তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে পুরো জেলা। সূর্যের দেখা মিলছে অনেক দেরিতে, আর হিমেল হাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ এবং শিশু ও বৃদ্ধরা এই তীব্র শীতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
তাপমাত্রার পারদ পতনের রেকর্ড
গোপালগঞ্জ আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বুধবার সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি শুধু গোপালগঞ্জের নয়, আজকের দিনে সারাদেশের মধ্যেই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। আবহাওয়া অধিদপ্তর নিশ্চিত করেছে যে, চলতি শীত মৌসুমে এটিই এখন পর্যন্ত দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড।
তাপমাত্রা কমার পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল অনেক বেশি, প্রায় ৯৭ শতাংশ। এর ফলে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়েছে। সেই সাথে ছিল ঘন কুয়াশা, যার কারণে দৃষ্টিসীমা নেমে এসেছিল ২০০ মিটারে। অর্থাৎ ২০০ মিটারের দূরের জিনিস খালি চোখে দেখা যাচ্ছিল না।
গোপালগঞ্জ আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবু সুফিয়ান জানিয়েছেন, “জেলায় বর্তমানে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা আরও দুই থেকে তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে। তাপমাত্রা আরও কিছুটা কমার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। শীতের এই তীব্রতা থেকে রক্ষা পেতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।”
হাড় কাঁপানো শীতে জবুথবু জনপদ
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শীতের তীব্রতায় মানুষ খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। ভোরবেলায় পুরো জনপদ কুয়াশায় এমনভাবে ঢাকা থাকে যে মনে হয় সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। মহাসড়কগুলোতে হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে।
শীতের কামড় থেকে বাঁচতে গ্রামের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এবং শহরের ফুটপাতে মানুষকে আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণতা নিতে দেখা গেছে। খড়কুটো, শুকনো পাতা বা পরিত্যক্ত টায়ার জ্বালিয়ে দলবেঁধে আগুন পোহাচ্ছেন নানা বয়সী মানুষ। বিশেষ করে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে শীতের প্রকোপ আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। ঠান্ডা বাতাসে সেখানে বসবাসরত মানুষের জীবনযাত্রা এক প্রকার অচল হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বিপাকে খেটে খাওয়া মানুষ
এই তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক এবং কৃষি শ্রমিকরা। পেটের তাগিদে হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করেও খুব সকালে তাদের কাজের সন্ধানে বের হতে হচ্ছে। কিন্তু শীতের কারণে কাজ কমে যাওয়ায় তাদের আয়-রোজগারে ভাটা পড়েছে।
গোপালগঞ্জ শহরের রিকশাচালক আব্দুল মজিদ তার কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, “মামা, এই শীতে রিকশার হ্যান্ডেল ধরাই দায়। হিমেল বাতাসে হাত-পা জমে আসে, রিকশা চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর তীব্র শীতের কারণে মানুষজন খুব একটা বাসা থেকে বের হচ্ছে না। তাই যাত্রীও পাচ্ছি না, আমাদের আয়-রোজগার অনেকটা কমে গেছে। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।”
শহরের বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষের হাটে গিয়ে দেখা যায়, কাজের আশায় শ্রমিকরা বসে থাকলেও কাজ দাতা বা গৃহস্থদের দেখা মিলছে কম। অনেকেই কাজ না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।
হাসপাতালে বাড়ছে শীতজনিত রোগী
তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সাথে সাথে জেলার হাসপাতালগুলোতে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্করা নিউমোনিয়া, ঠান্ডা-কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি।
গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েকদিনে বহির্বিভাগ এবং জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ বেড়েছে। চিকিৎসকরা এই সময়ে শিশু ও বৃদ্ধদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। ঠান্ডা লাগা থেকে বিরত থাকা এবং গরম কাপড় পরিধান করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
কৃষিতে শীতের প্রভাব ও শঙ্কা
তীব্র শীত এবং ঘন কুয়াশা শুধু জনজীবন নয়, কৃষিক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জেলার কৃষকরা তাদের বোরো ধানের বীজতলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। টানা কুয়াশা এবং শৈত্যপ্রবাহের কারণে বীজতলায় ‘কোল্ড ইনজুরি’ বা চারা হলুদ হয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া আলু এবং শীতকালীন বিভিন্ন শাকসবজির ফলনও এই আবহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা।
কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা এবং জমিতে পরিমিত সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে শীতের ক্ষতি কিছুটা কমিয়ে আনা যায়।
আরও কয়েকদিন ভোগান্তির পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, গোপালগঞ্জসহ আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে এই মুহূর্তে শীত কমার কোনো সুখবর নেই। চলতি সপ্তাহজুড়ে জেলায় ঘন কুয়াশা ও তীব্র শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। এমনকি রাতের তাপমাত্রা আরও কিছুটা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় শীতবস্ত্রের বরাদ্দ এখনো অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
প্রকৃতির এই বৈরী আচরণে গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুতই সূর্যের দেখা মিলবে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসবে। ততক্ষণ পর্যন্ত এই হাড়কাঁপানো শীতের সাথে লড়াই করেই টিকে থাকতে হবে তাদের।








