জানাজার নামাজ হলো একজন মৃত মুসলমানের জন্য জীবিতদের পক্ষ থেকে করা শেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ ফরয ইবাদত। এটি মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত ও ক্ষমা প্রার্থনার জন্য আল্লাহর দরবারে সম্মিলিত আবেদন। এই প্রবন্ধে আমরা জানাজার নামাজের নিয়ম, দোয়া, এর গুরুত্ব এবং সহীহ দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা করব।
জানাজার নামাজ কী ও কেন পড়া হয়?
এই জানাজার নামাজ মূলত একটি বিশেষ ইবাদত, যা অন্যান্য নামাজের (যেমন: ফজর, যোহর) মতো রুকু, সিজদা বা বৈঠক ছাড়াই দাঁড়িয়ে আদায় করা হয়।
জানাজার নামাজের সংজ্ঞা
জানাজার নামাজ (সালাতুল জানাযা) হলো মৃত মুসলমানকে দাফন করার আগে তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত চাওয়ার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট নিয়মে সম্মিলিতভাবে পাঠ করা দোয়া বিশেষ। এটি মূলত ফরয-এ-কিফায়া (فرض كفاية)।
ইসলাম ধর্মে জানাজার নামাজের গুরুত্ব
ইসলামে জানাজার নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি পরকালের প্রথম ধাপ শুরু করার আগে তাঁর পাপ মোচন এবং মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর সাহায্য লাভ করে। এটি জীবিতদের পক্ষ থেকে মৃত ব্যক্তির প্রতি শেষ সম্মান ও কর্তব্য পালন।
মৃত মুসলমানের উপর জানাজা পড়া কি ফরজ?
জানাজার নামাজ পড়া হলো ফরয-এ-কিফায়া (فرض كفاية)। এর অর্থ হলো, যদি কোনো এলাকায় কিছু সংখ্যক মুসলমান এই নামাজ আদায় করে নেয়, তবে সেই এলাকার অন্য সকল মুসলমানের উপর থেকে এই ফরয পালনের দায়িত্ব রহিত হয়ে যায়। কিন্তু যদি কেউই না পড়ে, তবে সেই এলাকার সকল সক্ষম ব্যক্তি গুনাহগার হবে।
জানাজার নামাজের নিয়ম দলিলসহ: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মৃত ব্যক্তির জানাজা আদায় করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও তা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
হাদীস: আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় কোনো মুসলমানের জানাজার সাথে যায় এবং তার জানাজার সালাত আদায় করে ও দাফন শেষ হওয়া পর্যন্ত তার সাথে থাকে, সে দুই কীরাত সওয়াব নিয়ে ফিরে আসে। আর যে শুধু জানাজার সালাত আদায় করে ফিরে আসে, সে এক কীরাত সওয়াব নিয়ে ফিরে আসে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৪৭)
জানাজার নামাজ কত রাকাত ও কীভাবে পড়তে হয়?
এই জানাজার নামাজ অন্যান্য নামাজের মতো রাকাতের হিসেবে গণনা করা হয় না।
জানাজার নামাজ রাকাত নাকি তাকবির?
এই জানাজার নামাজে কোনো রুকু বা সিজদা না থাকায় এটিকে রাকাত হিসেবে গণ্য করা হয় না। বরং এটি তাকবির (আল্লাহু আকবার) এর উপর ভিত্তি করে আদায় করা হয়। জানাজার নামাজে মোট ৪টি তাকবির রয়েছে।
জানাজার নামাজ মোট ৪ তাকবির
এই জানাজার নামাজ ৪টি তাকবিরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়:
- প্রথম তাকবির: নিয়ত করার পর।
- দ্বিতীয় তাকবির: সানা (সুবহানাকা) পড়ার পর।
- তৃতীয় তাকবির: দরুদ শরীফ (দরুদে ইব্রাহিম) পড়ার পর।
- চতুর্থ তাকবির: বিশেষ দোয়া পড়ার পর।
জানাজার নামাজের নিয়ম (ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা)
জানাজা পড়ার নিয়ম ( janajar niyom bangla ) অত্যন্ত সহজ এবং এটি দাঁড়িয়ে কিবলার দিকে মুখ করে আদায় করতে হয়।
১. নিয়ত করার নিয়ম
মনে মনে বা মুখে নিয়ত করা যেতে পারে। নিয়ত হলো “আমি ফরয-এ-কিফায়া জানাজার নামাজ চার তাকবিরের সহিত, এই ইমামের পিছনে, এই মৃত ব্যক্তির জন্য কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আদায় করছি।”
২. প্রথম তাকবির ও সানা পড়া (সুবহানাকা)
ইমাম উচ্চস্বরে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে প্রথম তাকবির দেবেন। মুক্তাদিগণও আস্তে করে তাকবির বলে হাত বাঁধবেন (সাধারণ নামাজের মতো)। এরপর মনে মনে সানা পড়বেন।
সানা:
“سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ” (হানাফি মতে, অন্যান্য মাযহাবে ভিন্নতা থাকতে পারে)।
৩. দ্বিতীয় তাকবির ও দরুদ শরীফ
ইমাম দ্বিতীয়বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন (এসময় হাত তুলতে হবে না)। এরপর মুক্তাদিগণ মনে মনে দরুদে ইব্রাহিম পড়বেন।
দরুদে ইব্রাহিম: (যা আমরা নিয়মিত নামাজে পড়ি)
“اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ…” থেকে শেষ পর্যন্ত।
৪. তৃতীয় তাকবির ও বিশেষ দোয়া
ইমাম তৃতীয়বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন (এসময়ও হাত তুলতে হবে না)। এরপর মুক্তাদিগণ মৃত ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ দোয়া পড়বেন।
বিশেষ দোয়া: (প্রাপ্ত বয়স্কের জন্য)
“اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا ۚ اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلَامِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الْإِيمَانِ”
বাংলা উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মাগফির লি-হাইয়্যিনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহীদিনা ওয়া গাইবিনা ওয়া সাগীরিনা ওয়া কাবীরিনা ওয়া যাকারিনা ওয়া উনছানা। আল্লাহুম্মা মান আহ্য়াইতাহু মিন্না ফা-আহয়িহী আলাল ইসলাম। ওয়া মান তাওয়াফ্ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ্ফাহু আলাল ঈমান।”
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃতদের, উপস্থিত ও অনুপস্থিতদের, ছোট ও বড়দের এবং পুরুষ ও নারীদের ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যাদের আপনি জীবিত রাখেন, তাদের ইসলামের উপর জীবিত রাখুন। আর যাদের মৃত্যু দেন, তাদের ঈমানের সাথে মৃত্যু দিন।”
৫. চতুর্থ তাকবির ও সালাম
ইমাম চতুর্থবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন (এসময়ও হাত তুলতে হবে না)। এরপর আর কোনো দোয়া পড়তে হবে না। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ইমাম প্রথমে ডান দিকে এবং পরে বাম দিকে সালাম ফেরাবেন। মুক্তাদিগণও ইমামকে অনুসরণ করে সালাম ফেরাবেন। সালামের মাধ্যমে জানাজার নামাজ শেষ হবে।
জানাজার নামাজের দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
এখানে পুরুষ, নারী ও ছোট শিশুদের জন্য জানাজার নামাজের বিশেষ দোয়া দেওয়া হলো।
মৃত পুরুষের জন্য দোয়া
জানাজার নামাজের দোয়া আরবি উচ্চারণ
“اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِنْ دَارِهِ وَأَهْلًا خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ وَزَوْجًا خَيْرًا مِنْ زَوْجِهِ وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ”
জানাজার নামাজের দোয়া বাংলা উচ্চারণ
আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু ওয়া আ-ফিহি ওয়া’ফু আনহু ওয়া আকরিম নুযুলাহু ওয়া ওয়াস্সি‘ মুদখালাহু ওয়াগসিলহু বিল মা-য়ি ওয়াছ ছালজি ওয়াল বারাদি, ওয়া নাক্কিহি মিনাল খাতা-য়া কামা ইউ নাক্কাছ ছাওবুল আব্য়াদু মিনাদ দানাসি, ওয়া আবদিলহু দা-রান খাইরাম মিন দা-রিহি ওয়া আহলান খাইরাম মিন আহলিহি ওয়া যাওজান খাইরাম মিন যাওজিহি, ওয়া আদখিলহুল জান্নাতা ওয়া আ-ইযহু মিন আযাবিল কাবরি ওয়া মিন আযা-বিন নার।
জানাজার নামাজের দোয়া বাংলা অর্থ
হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি রহম করুন, তাকে নিরাপত্তা দিন, তাকে মাফ করে দিন, তার বাসস্থান সম্মানিত করুন, তার প্রবেশস্থান প্রশস্ত করুন। তাকে পানি, বরফ ও শিলা দিয়ে ধুয়ে দিন এবং পাপরাশি হতে তাকে এমনভাবে পরিষ্করণ করুন, যেমন সাদা কাপড় ময়লা হতে পরিষ্কার করা হয়। তাকে তার বর্তমান ঘরের চেয়ে উত্তম ঘর, তার বর্তমান পরিবার অপেক্ষা উত্তম পরিবার এবং বর্তমান স্ত্রীর চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করুন। আর তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান এবং কবরের আযাব ও জাহান্নামের আযাব হতে তাকে রক্ষা করুন।
মৃত নারীর জন্য দোয়া
পুরুষের দোয়ায় ‘লাহু’ (لَهُ) এর স্থলে ‘লাহা’ (لَهَا) এবং ‘হু’ (هُ) এর স্থলে ‘হা’ (هَا) সর্বনাম ব্যবহার করতে হবে।
আরবি: “اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهَا وَارْحَمْهَا…” (লাহু/হু-এর স্থানে লাহা/হা)
ছোট শিশুদের জানাজার দোয়া
যে শিশু বালেগ হওয়ার আগেই মারা গেছে, তার জন্য এই বিশেষ দোয়া পড়তে হয়।
আরবি: “اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرَطًا وَاجْعَلْهُ لَنَا أَجْرًا وَذُخْرًا وَاجْعَلْهُ لَنَا شَافِعًا وَمُشَفَّعًا”
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাজ‘আলহু লানা ফারাতাওঁ, ওয়াজ‘আলহু লানা আজরাঁও ওয়া যুখরাঁও, ওয়াজ‘আলহু লানা শা-ফি‘আওঁ ওয়া মুশাফ্ফা‘আ।
অর্থ: হে আল্লাহ! এই শিশুটিকে আমাদের জন্য অগ্রগামী, সওয়াব ও প্রতিদানস্বরূপ করুন এবং তাকে আমাদের জন্য সুপারিশকারী এবং কবুলযোগ্য সুপারিশকারী বানান।
জানাজার নামাজের নিয়ম হানাফি মতে
মাযহাবগত সামান্য কিছু পার্থক্য রয়েছে, যা মূলত মুস্তাহাব বা সুন্নত পর্যায়ের।
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী ৪ তাকবিরের বিস্তারিত
হানাফি মাযহাবেও জানাজার নামাজে ৪টি তাকবির দেওয়া সুন্নাহ। প্রথম তাকবিরের পর সানা এবং দ্বিতীয় তাকবিরের পর দরুদে ইব্রাহিম পড়তে হয়। এরপর তৃতীয় তাকবিরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া পড়তে হয় এবং চতুর্থ তাকবিরের পর সালাম ফেরাতে হয়।
হাত বাঁধার নিয়ম
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, প্রথম তাকবিরের সাথে সাধারণ নামাজের মতো নাভির নিচে বা উপরে হাত বাঁধতে হয় এবং চতুর্থ তাকবিরের পর সালাম ফেরানোর আগ পর্যন্ত হাত বাঁধা অবস্থাতেই থাকবে।
দোয়া ও দরুদ পড়ার পদ্ধতি
সকল দোয়া ও দরুদ মুক্তাদিগণ আস্তে বা মনে মনে পড়বেন। ইমাম উচ্চস্বরে শুধু তাকবিরগুলো দেবেন।
সালাম দেওয়ার নিয়ম
ডান দিকে ও বাম দিকে একবার করে সালাম ফেরাতে হয়। ডান দিকের সালামে মৃত ব্যক্তি ও উপস্থিত মানুষের জন্য কল্যাণ কামনা এবং বাম দিকেও একই নিয়ত থাকে।
জানাজার নামাজের নিয়ম আহলে হাদিস মতে
আহলে হাদিস বা সালাফি মতাদর্শীগণ সরাসরি সহীহ হাদীসের ওপর আমলকে অগ্রাধিকার দেন, তাই কিছু ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত সামান্য পার্থক্য দেখা যায়।
জানাজার নামাজের তাকবির সংখ্যা
আহলে হাদিস মতেও সাধারণত ৪ তাকবিরই প্রচলিত। তবে সহীহ হাদীসে ৫, ৬ বা ৭ তাকবিরের প্রমাণও রয়েছে, যা কখনো কখনো অঞ্চলভেদে বা ইমামের ইজতিহাদ অনুসারে মানা যেতে পারে (যেমন উমর রাঃ চার তাকবির এবং ইবনে আব্বাস রাঃ চার তাকবিরে পাঁচবারও তাকবির দিয়েছেন)। তবে প্রচলিত ও সহীহ মত হলো ৪ তাকবির।
হাত বাঁধা না খোলা রাখার বিধান
আহলে হাদিস আলেমদের অনেকে তাকবির দেওয়ার পর হাত নাভির নিচে না বেঁধে বুকের উপরে বাঁধার কথা বলেন (সাধারণ সালাতের মতো)। তবে ৪ তাকবিরের পরে সালাম ফেরানোর আগ পর্যন্ত হাত বাঁধা অবস্থাতেই থাকবে।
দোয়া পড়ার পার্থক্য
সাধারণত মূল দোয়ার ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য থাকে না। তবে সানা বা দরুদ পড়ার ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য দেখা যেতে পারে, যা সরাসরি হাদীস থেকে নেওয়া।
জানাজার নামাজে সাধারণ ভুলগুলো
অজ্ঞতা বা তাড়াহুড়োর কারণে অনেকেই জানাজার নামাজে কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন।
- ভুল উচ্চারণ: তাড়াহুড়ো করে দোয়ার সঠিক আরবি উচ্চারণ না করা।
- অযথা লম্বা দোয়া পড়া: নির্ধারিত দোয়ার বাইরে অতিরিক্ত বা অপ্রাসঙ্গিক দোয়া পাঠ করা।
- তাকবির বিভ্রান্তি: অনেকে ইমামের তাকবিরের সাথে সাথে অতিরিক্ত হাত তোলেন, যা শুধুমাত্র প্রথম তাকবিরেই সুন্নাত।
- দোয়ার সময় হাত উঠানো: জানাজার নামাজের কোনো দোয়ার সময় বা তাকবিরের পর হাত উঠানোর বিধান নেই।
জানাজার নামাজের দলিলসমূহ (হাদিস রেফারেন্স)
জানাজার নামাজের বৈধতা ও পদ্ধতি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নত এবং সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
সহীহ বুখারী হাদিস
দলিল: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর মৃত্যুর পর গায়েবানা জানাজার সালাত আদায় করেছিলেন। তিনি সাহাবীদের নিয়ে কাতার করে তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন। (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১২৪৫, ১২৪৬) – এটি জানাজার সালাতের বৈধতা প্রমাণ করে।
সহীহ মুসলিম হাদিস
দলিল: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর সাহাবীকে জানাজার সালাতে কী বলতে হয়, তা শিক্ষা দিয়েছেন। যেখানে তিনি মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমার দোয়া করতে শিখিয়েছেন। (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৯৬৩) – এটি দোয়ার গুরুত্ব ও পদ্ধতি প্রমাণ করে।
অন্যান্য হাদিস গ্রন্থের রেফারেন্স
তিরমিযী ও আবু দাউদসহ অন্যান্য গ্রন্থে জানাজার কাতার, লাশের অবস্থান এবং তাকবির সংখ্যা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
জানাজার নামাজের সুন্নত ও আদব
জানাজার নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে কিছু সুন্নত ও আদব রয়েছে, যা অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়।
- কাতারের নিয়ম: জানাজার নামাজে বেজোড় সংখ্যক (৩, ৫, ৭) কাতার করা মুস্তাহাব। এটি মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর রহমত লাভের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
- লাশের অবস্থান: লাশ কিবলার দিকে রেখে তার সামনে ইমাম দাঁড়াবেন।
- ইমাম কোথায় দাঁড়াবেন: মৃত পুরুষ হলে ইমাম লাশের মাথার বরাবর দাঁড়াবেন।
- মৃত ব্যক্তি নারী হলে ইমামের অবস্থান: মৃত নারী হলে ইমাম লাশের কোমরের বা মধ্যভাগের বরাবর দাঁড়াবেন।
কাদের জানাজার নামাজ পড়া হয় না
কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে জানাজার নামাজের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়।
- শহীদের জানাজা: জিহাদের ময়দানে নিহত শহীদকে (যিনি সরাসরি মারা যান) গোসল দেওয়া এবং তার জন্য জানাজার নামাজ পড়া হয় না। তাদের রক্ত মাখা পোশাকসহ দাফন করা হয়। তবে অন্যান্য শহীদের (যেমন: দুর্ঘটনায় মৃত) জানাজা পড়া যেতে পারে।
- অমুসলিমের জানাজা: অমুসলিমের জন্য জানাজার নামাজ পড়া বা তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
- আত্মহত্যা সম্পর্কে ভুল ধারণা দূরীকরণ: আত্মহত্যা ইসলামে জঘন্যতম পাপ হলেও, আত্মহত্যাকারীর জানাজার নামাজ পড়া জায়েজ। যদিও কিছু আলেম সামাজিক সচেতনতার জন্য ইমামকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেন, কিন্তু সাধারণ মুসলমানেরা তার জানাজা অবশ্যই আদায় করবেন।
মহিলাদের জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ
জানাজার নামাজে মহিলাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে শরীয়তের ভিন্নমত রয়েছে।
শরীয়তসম্মত ব্যাখ্যা
মহিলারা জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। এই বিষয়ে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে, ফিতনা বা অনিয়ম এড়াতে অনেক আলেম মহিলাদের ঘরে থেকে দোয়া করার পরামর্শ দেন। যদি তারা পর্দার সাথে এবং ভিড় এড়িয়ে নামাজ আদায় করতে পারেন, তবে অংশগ্রহণ করা জায়েজ।
কবরস্থানে যাওয়া সম্পর্কে আলেমদের মত
অধিকাংশ আলেম মহিলাদের জন্য মৃতকে দাফনের সময় কবরস্থানে যাওয়াকে অনুৎসাহিত করেছেন বা মাকরূহ বলেছেন, যেহেতু এই পরিস্থিতিতে তাদের আবেগের বশে ধৈর্যচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
জানাজার নামাজের পর করণীয়
জানাজার নামাজ শেষে দ্রুততার সাথে মৃতকে দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়।
দোয়া করা
অনেকে জানাজার পর সম্মিলিতভাবে হাত তুলে দোয়া করেন। যদিও জানাজার নামাজটাই মূলত দোয়া, তবে কবরের কাছে যাওয়ার পর ব্যক্তিগতভাবে বা সম্মিলিতভাবে মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষভাবে দোয়া করা যেতে পারে।
দাফনের নিয়ম
জানাজা শেষে দ্রুত মৃতদেহ কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া সুন্নাত। লাশ কবরে নামানোর সময় দোয়া পড়তে হয় এবং দাফন শেষে মৃত ব্যক্তির জন্য সম্মিলিতভাবে দোয়া ও ইসালে সওয়াব করা হয়।
ময়্যেতের জন্য সদকা ও ইসালে সওয়াব
দাফনের পর মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে বা তার উদ্দেশ্যে নেক কাজ (যেমন: সদকা, কোরআন তেলাওয়াত, রোজা রাখা) করে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তির রূহে প্রেরণ করা (ইসালে সওয়াব) অত্যন্ত উত্তম কাজ।
জানাজার নামাজ সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: জানাজার নামাজ পড়া কি ফরজ?
উত্তর: জানাজার নামাজ পড়া হলো ফরয-এ-কিফায়া। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক মুসলমান আদায় করলে সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়।
প্রশ্ন: জানাজার নামাজ কত তাকবিরে সম্পন্ন হয়?
উত্তর: জানাজার নামাজ মোট ৪টি তাকবিরে সম্পন্ন হয়।
প্রশ্ন: জানাজার নামাজে রুকু বা সিজদা আছে কি?
উত্তর: না, জানাজার নামাজে কোনো রুকু বা সিজদা নেই, এটি শুধু দাঁড়িয়ে আদায় করতে হয়।
প্রশ্ন: প্রথম তাকবিরের পর কী পড়তে হয়?
উত্তর: প্রথম তাকবিরের পর সাধারণ নামাজের সানা (সুবহানাকা) পড়তে হয়।
প্রশ্ন: দ্বিতীয় তাকবিরের পর কী পড়তে হয়?
উত্তর: দ্বিতীয় তাকবিরের পর দরুদে ইব্রাহিম পড়তে হয়।
প্রশ্ন: মৃত পুরুষের জন্য দোয়ার শুরুতে কী বলতে হয়?
উত্তর: মৃত পুরুষের জন্য দোয়ার শুরুতে ‘আল্লাহুম্মাগফির লাহু’ বলতে হয়।
প্রশ্ন: মৃত নারীর জন্য দোয়ায় কোন পার্থক্য আসে?
উত্তর: মৃত নারীর জন্য দোয়ায় ‘লাহু’ (পুরুষ) এর স্থলে ‘লাহা’ (নারী) সর্বনাম ব্যবহার করতে হয়।
প্রশ্ন: জানাজার নামাজে হাত বাঁধার নিয়ম কী? (হানাফি মতে)
উত্তর: হানাফি মাযহাব মতে, প্রথম তাকবিরের পর নাভির নিচে বা উপরে হাত বাঁধতে হয় এবং সালাম না ফেরানো পর্যন্ত বাঁধা থাকে।
প্রশ্ন: জানাজার নামাজের সবচেয়ে বড় সওয়াব কী?
উত্তর: জানাজা পড়া ও দাফন পর্যন্ত সাথে থাকলে দুই কীরাত সওয়াব লাভ হয়।
প্রশ্ন: শহীদের জানাজার নামাজ পড়তে হয় কি?
উত্তর: জিহাদের ময়দানে নিহত শহীদকে (যিনি সরাসরি মারা যান) গোসল দেওয়া এবং জানাজার নামাজ পড়া হয় না, রক্ত মাখা পোশাকসহ দাফন করা হয়।
প্রশ্ন: জানাজার নামাজ কত রাকাত?
উত্তর: জানাজার নামাজ রাকাতের হিসাবে হয় না, বরং এতে চারটি তাকবির (আল্লাহু আকবার) থাকে, যেখানে প্রতিটি তাকবির এক রাকাতের সমতুল্য, এবং কোনো রুকু-সেজদা নেই, এটি মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া, যা দাঁড়িয়ে আদায় করতে হয় এবং এতে চারটি তাকবির বলার পর সালাম ফেরানো হয়।
নিচে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নামাজের নিয়ম দেয়া হলো
- ফজর নামাজের সময়: কখন শুরু, কখন শেষ সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা ও ইসলামিক গাইড
- সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ম, ফজিলত ও আদায়ের সহজ পদ্ধতি
- ফজর নামাজের নিয়ম ও দোয়া: দিনের সূচনা আল্লাহর সন্তুষ্টিতে
- বেতের নামাজের নিয়ম, সূরা, নিয়ত ও ফজিলত পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন
- তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার নিয়ম ও নিয়ত সম্পূর্ণ গাইডলাইন
- মেয়েদের নামাজের নিয়ম: ইসলামের আলোকে সম্পূর্ণ গাইডলাইন
- শবে বরাত নামাজের নিয়ম, আমল ও বর্জনীয় কাজের ইসলামী নির্দেশনা
- শবে কদর নামাজের নিয়ম, দোয়া ও ইসলামী নির্দেশনা: হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ রাত
- তারাবির নামাজের নিয়ম: প্রতিটি মুসলমানের জন্য সহজ ও পূর্ণাঙ্গ গাইড
- নামাজের নিষিদ্ধ সময়: কখন নামাজ পড়া যাবে না পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক গাইডলাইন








