জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘জুলাই সনদ’ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এক মঞ্চে এল বিভিন্ন ধারার রাজনৈতিক শক্তি। আয়োজক ছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। অনুষ্ঠানে ২৫টি দল ও জোটের নেতা উপস্থিত থাকেন, তাঁদের মধ্যে ২৪টি দল/জোট স্বাক্ষর করেন। কমিশনের পাঠানো তালিকা ও দলগুলোর তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়, সই করা দলগুলোর মধ্যে নিবন্ধিত দল ১৯টি, আরও কয়েকটি দল নিবন্ধনহীন হলেও তারা সনদে অংশ নেয়। উপস্থিত থেকে সই না করা দলও ছিল, ফলে সমর্থন ও দ্বিমত–দুটো চিত্রই সামনে আসে।
কী হলো অনুষ্ঠানে
অনুষ্ঠান শুরুর আগে থেকেই দক্ষিণ প্লাজায় কড়া নিরাপত্তা ছিল। আমন্ত্রিত দলগুলো ক্রমানুসারে তাদের দুইজন করে প্রতিনিধির নাম আগে থেকেই পাঠায়। মঞ্চে ডাকা হলে দল ও জোটের প্রতিনিধিরা নির্ধারিত পৃষ্ঠায় সই করেন। আয়োজকেরা জানান, এই সনদে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব, বাস্তবায়নের নীতিগত অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। লক্ষ্য, রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারকে একটি সম্মিলিত অঙ্গীকারে রূপ দেওয়া।
কারা সই করলেন
নিচে সই করা দল/জোটের প্রতিনিধিদের তালিকা সংক্ষেপে দেওয়া হলো (প্রতি পক্ষ থেকে দুজন):
১) এলডিপি—রেদোয়ান আহমেদ, নেয়ামূল বশির
২) খেলাফত মজলিস—আবদুল বাছিত আজাদ, আহমদ আবদুল কাদের
৩) রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন—হাসনাত কাইয়ূম, সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন
৪) এবি পার্টি—মো. মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু, আসাদুজ্জামান ফুয়াদ
৫) নাগরিক ঐক্য—মাহমুদুর রহমান মান্না, শহীদুল্লাহ কায়সার
৬) এনডিএম—ববি হাজ্জাজ, মোমিনুল আমিন
৭) বিএনপি—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সালাহউদ্দিন আহমদ
৮) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস—ইউসুফ আশরাফ, জালালুদ্দীন আহমদ
৯) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, মিয়া গোলাম পরওয়ার
১০) গণসংহতি আন্দোলন—জোনায়েদ সাকি, আবুল হাসান রুবেল
১১) জেএসডি—শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, তানিয়া রব
১২) গণ অধিকার পরিষদ—নুরুল হক, মো. রাশেদ খান
১৩) বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি—সাইফুল হক, বহ্নিশিখা জামালী
১৪) জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট—ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, খন্দকার লুৎফর রহমান
১৫) ১২–দলীয় জোট—মোস্তফা জামাল হায়দার, শাহাদাত হোসেন সেলিম
১৬) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ—অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, গাজী আতাউর রহমান
১৭) গণফোরাম—(অনুষ্ঠানে উপস্থিত; নিচে দেখুন সই করেনি)
১৮) জাকের পার্টি—শহীদুল ইসলাম ভুইয়া, জহিরুল হাসান শেখ
১৯) জাতীয় গণফ্রন্ট—আমিনুল হক টিপু বিশ্বাস, মঞ্জুরুল আরেফিন লিটু বিশ্বাস
২০) বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি—আবদুল মাজেদ আতহারী, মুসা বিন ইযহার
২১) বাংলাদেশ লেবার পার্টি—মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, খন্দকার মিরাজুল ইসলাম
২২) ভাসানী জনশক্তি পার্টি—শেখ রফিকুল ইসলাম (বাবলু), মোহাম্মদ আবু ইউসুফ (সেলিম)
২৩) জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ—আব্দুর রব ইউসুফী, মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী
২৪) ইসলামী ঐক্যজোট—আব্দুল কাদের, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী
২৫) আমজনতার দল—কর্নেল (অব.) মিয়া মশিউজ্জামান, মো. তারেক রহমান
উপরের তালিকা অনুযায়ী স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ২২টি দল ও ২টি জোট রয়েছে। সইকারী দলগুলোর মধ্যে ৪টি নিবন্ধনহীন, আর জোটের স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে তিনজনের দল নিবন্ধনহীন—তথ্য অনুযায়ী এমনটাই পাওয়া গেছে।
কারা সই করেনি
স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেও কিংবা আমন্ত্রিত হয়েও ৬টি দল সই করেনি—জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্ক্সবাদী), বাংলাদেশ জাসদ এবং গণফোরাম।
- এনসিপি আগে থেকেই জানিয়েছিল, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি না পেলে তারা সই করবে না, তারা সে অনুযায়ী অনুষ্ঠানে যায়নি।
- চার বাম দল বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বলে, সব দলের ঐকমত্য নেই, তাদের সংশোধনী আমলে নেওয়া হয়নি এবং ইতিহাস উপস্থাপনায় ভুল রয়েছে, তাই সই না করার সিদ্ধান্ত।
- গণফোরাম অনুষ্ঠানে অংশ নিলেও সই করেনি। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, খসড়ায় কিছু সংশোধন আনা হয়েছে বলে তারা জেনেছেন, কমিশনের সঙ্গে আলোচনার পর স্বাক্ষর করা নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
নিবন্ধিত দল কত, সই করল কত
নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ৫২টি। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে, সেই বাস্তবতায় আলোচনায় ১৪ দল বা জাতীয় পার্টি অংশীদারদের ডাকা হয়নি। ফলে সইকারীদের মধ্যে নিবন্ধিত দল ১৯টি থাকলেও, অংশগ্রহণের পরিধি কেবল বিরোধী বা বিকল্প ধারার দল, জোটকেই ঘিরে ছিল। অনুষ্ঠানে একেক দল ও জোটের পক্ষ থেকে দুজন করে সই করেন—মোট ৪৮ জন স্বাক্ষর করেন।
কেন এই ‘জুলাই সনদ’
ঐকমত্য কমিশন ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই, দুই পর্বে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা চালায়। মূল লক্ষ্য ছিল সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা, এ সব খাতে সংস্কারের নীতিগত ঐকমত্য গড়া। আলোচনায় অধিকাংশ প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়, বাকি কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সনদে অঙ্গীকারের মূল রূপরেখা রাখা হয়। ফলে এটি বাধ্যতামূলক আইনি দলিল নয়, বরং ভবিষ্যৎ সরকার ও দলগুলোর নীতিগত অঙ্গীকারনামা যা পরের ধাপে আইন, নীতিতে রূপ পাবে।
মতভেদ কোথায়
বিভিন্ন দল বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত জানায়। কেউ গণভোটের কথা বলে, কেউ সংসদীয় প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়। গণভোটের সময়, প্রশ্ন ও ভিত্তি, এসব নিয়েই মূলত মতপার্থক্য। এনসিপি ও চার বাম দলের আপত্তির কেন্দ্রে ছিল আইনি বাধ্যবাধকতা ও সংশোধনী অন্তর্ভুক্তি না হওয়া। ফলে তারা সই না করার ঘোষণা দেয়। এতে বোঝা যায়, সম্মিলন শুরু হলেও পূর্ণ ঐকমত্য এখনও হয়নি।
সংখ্যার দিক থেকে ‘খারাপ নয়’, তবু প্রশ্ন রয়ে যায়
লেখক–গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, আলোচনায় অংশ নেওয়া দল, জোটের ৩০টির মধ্যে ২৪টি সই করায় সংখ্যার দিক থেকে এটি খারাপ নয়। চার বাম দলের সই না করা বড় বাধা তৈরি করবে না বলেও তিনি মত দেন। তবে এনসিপির অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো কারণ, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের অংশ নিয়ে দলটি গঠিত। তার মানে, আন্দোলনের একাংশের দাবিদাওয়া এখনও পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে অনেক সময় ‘জাতীয়’ শব্দটি সহজে ব্যবহার হয়। রাজনীতিকে তিনি বলেন এক ধরনের খেলা, এখানে পরাজিতের মতামত সহজে স্থান পায় না। ভবিষ্যতে ক্ষমতার সমীকরণ বদলালে, আগের অবস্থানও পাল্টাতে পারে অর্থাৎ এই সনদকেও রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রভাবিত করবে।
অনুষ্ঠানের বাইরে কী ঘটেছে
স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের বাইরে বিক্ষোভও হয়েছে, বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের অংশ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারগুলো স্বীকৃতি ও কল্যাণ নিশ্চয়তা চেয়ে স্লোগান দেয়। পুলিশি টানাপোড়েন, ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া, এমন চিত্রও দেখা যায়। ফলে ভিতরে স্বাক্ষর হলেও বাইরে অসন্তোষ স্পষ্ট, যা সামনে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় চাপ হিসেবে আসতে পারে।
সামনে কী
- বাস্তবায়ন রোডম্যাপ: কমিশন বলছে, সনদের বাস্তবায়নপদ্ধতি আলাদা সুপারিশ হিসেবে দেওয়া হবে, যার মধ্যে গণভোট বা আইন/আদেশ যে পথেই হোক, বাধ্যতামূলক কাঠামো তৈরি করার প্রস্তাব থাকতে পারে।
- নির্বাচনপূর্ব সময়সূচি: ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলগুলোকে সম্মিলিত অবস্থান রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ।
- অংশগ্রহণের বিস্তার: সই না করা দল ও জোটগুলোকে আলোচনায় ফেরানো গেলে সনদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুমতের, বিরোধিতার ধারায় একই মঞ্চে নানা মতের দল, জোটের স্বাক্ষর, এটি প্রতীকী বার্তা দেয়। এতে বিচার, প্রশাসন, নির্বাচন এ সংস্কারের জনসমর্থনভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে। তবে আইনি বাধ্যবাধকতা ও অন্তর্ভুক্তি দুটো বিষয়ই সামনে আসলেই, ‘জুলাই সনদ’ টেকসই রোডম্যাপ হয়ে উঠবে।
জুলাই সনদ আপাতত ঐকমত্যের অঙ্গীকারনামা। স্বাক্ষরের সংখ্যা আশাব্যঞ্জক, আলোচনার পরিধিও বড়। কিন্তু আইনি ভিত্তি আর সংশোধনী–স্বীকৃতি না এলে বাস্তবায়নের পথে প্রশ্ন থাকবে। এখন নজর থাকবে, কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশ, সরকার ও দলগুলোর কর্মপরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় কে কে যুক্ত হন সেখানেই।








