রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক চিকিৎসকের হাতে এক নার্সকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কর্মবিরতি পালন করছেন হাসপাতালের নার্সরা। এতে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে, ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগীরা।
ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার বিকেলে। হাসপাতালের নার্স কামরুল হাসান ও চিকিৎসক সৈকত তাওহিদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে সৈকত তাওহিদ আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে কামরুল হাসানকে মারধর করেন। এতে তিনি আহত হন এবং পরে তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালেই ভর্তি করা হয়।
সৈকত তাওহিদ হাসপাতালের ছাত্রদলের সভাপতি বলে জানা গেছে।
নার্সদের দাবি: ন্যায়বিচার না হলে কর্মসূচি চলবে
বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে নার্সরা সব ধরনের সেবা বন্ধ রাখেন। হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের সামনে তারা জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন এবং অভিযুক্ত চিকিৎসকের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
নার্সরা জানিয়েছেন, এ ঘটনায় দোষীদের দ্রুত শাস্তি না দিলে তারা কর্মবিরতি অব্যাহত রাখবেন।
সিনিয়র স্টাফ নার্স নাজমা আখতার বলেন,
“আমাদের সহকর্মীর গায়ে হাত তোলা হয়েছে। এটা নার্স সমাজের প্রতি অপমান। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই। না হলে কর্মসূচি আরও কঠোর হবে।”
নার্সদের এই অবস্থানে হাসপাতালের সাধারণ চিকিৎসা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আউটডোরে রোগীদের ভিড় থাকলেও চিকিৎসা দিতে দেখা যায়নি বেশিরভাগ বিভাগে। জরুরি বিভাগ আংশিকভাবে চালু ছিল, তবে পর্যাপ্ত নার্স না থাকায় সেবা দিতে সমস্যায় পড়তে হয় চিকিৎসকদের।
রোগীদের ভোগান্তি
হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, বিছানায় শুয়ে আছেন অনেক রোগী, কিন্তু নার্স না থাকায় ওষুধ কিংবা স্যালাইন পরিবর্তনের মতো কাজ বন্ধ রয়েছে। অনেক রোগীর স্বজন নিজেরাই স্যালাইন পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন।
একজন রোগীর স্বজন বলেন,
“আমরা সকাল থেকে নার্সের জন্য অপেক্ষা করছি। কেউ আসছেন না। রোগীর অবস্থা খারাপ হচ্ছে।”
এমন পরিস্থিতিতে অনেক রোগীকে প্রাইভেট ক্লিনিকে স্থানান্তর করার খবরও পাওয়া গেছে।
চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকায় হাসপাতালের প্রশাসনও চাপে পড়েছে।
প্রশাসনের অবস্থান
বিষয়টি নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. শিহাব উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
হাসপাতালের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে,
“ঘটনাটি তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য নিয়ে প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে।”
তবে কর্মবিরতি চলতে থাকলে হাসপাতালে সার্বিক কার্যক্রমে বড় প্রভাব পড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযুক্ত চিকিৎসক সৈকত তাওহিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
তবে হাসপাতালের ভেতরে থাকা এক সূত্র জানায়, ঘটনার পর থেকেই সৈকতকে হাসপাতালে দেখা যাচ্ছে না।
নার্সদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান
নার্সদের সংগঠনগুলোর নেতারা জানিয়েছেন,
“নার্স সমাজকে সম্মান না দিলে হাসপাতালের সেবা কখনো ঠিকভাবে চলতে পারে না। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক, নইলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে যাব।”
বিক্ষোভকারীরা হাসপাতালের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে “নার্সদের মর্যাদা রক্ষা করো”, “দোষীর বিচার চাই”—এমন স্লোগান দিচ্ছিলেন।
তাদের হাতে ছিল নানা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আলোচনার উদ্যোগ
অবস্থা ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠায় প্রশাসন ও নার্স নেতাদের মধ্যে আলোচনার চেষ্টা চলছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে হাসপাতালের কনফারেন্স রুমে একটি বৈঠক আহ্বান করা হয়, যেখানে নার্স প্রতিনিধি, প্রশাসন ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
বৈঠকে নার্সরা তাদের দাবি উপস্থাপন করবেন। প্রশাসনও দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে।
তবে বৈঠকের আগে পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত আছে ।
সার্বিক প্রভাব
এই ঘটনার ফলে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় রোগীরা যেমন ভোগান্তিতে পড়েছেন, তেমনি হাসপাতালের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নার্সদের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও ন্যায়বিচার না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যখাতের পর্যবেক্ষকরা।








