শনিবার রাজধানী ঢাকার চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। সেখানে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’-এ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের যে ঐতিহাসিক বিজয় বা অর্জন, তা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা একক কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। এটি দেশের আপামর জনসাধারণের সম্মিলিত ত্যাগের ফসল।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, ছাত্র-জনতার এই মহান আত্মত্যাগকে সরকার সর্বোচ্চ সম্মান ও মূল্যায়ন করবে। এই অর্জনকে ধরে রেখে একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে সরকার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই জুলাই মাসের সেই কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ এবং ছাত্র সমাজ যে উদ্দেশ্যে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে, সেই উদ্দেশ্যকে সফল করাই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
তিনি জোর দিয়ে বলেন:
- শহীদ ও আহতদের অবদানকে কখনো ভুলে যাওয়া হবে না।
- জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।
- আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং এটি অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য উপস্থিত সবার মনে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করে। তিনি বলেন, “যে রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি, সেই রক্তের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার পবিত্র দায়িত্ব।”
অন্যায়কারীদের বিচার হবে, তবে অবিচার নয়
দেশের বিচার ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, জুলাই মাসে যারা সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায় করেছে, জুলুম করেছে এবং নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে।
তবে একই সঙ্গে তিনি একটি বিশেষ সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিচারের নামে যেন কারও প্রতি কোনো ধরনের অবিচার না হয়, সেদিকে আমাদের কঠোরভাবে সতর্ক থাকতে হবে।” তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, সরকার কোনো ধরনের প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। আইন নিজের গতিতে চলবে এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সব বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
জাতিকে বিভক্ত নয়, ঐক্যবদ্ধ করে দেশ গড়তে চাই
বিগত সরকারের আমলের বিভাজনের রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিকে আর কোনোভাবেই দুই ভাগে ভাগ করা যাবে না। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে।
তিনি দেশের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য তুলে ধরে বলেন:
“আমরা জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে দেশকে পেছনে টেনে নিতে চাই না। আমাদের একমাত্র এবং মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশ ও দেশের জনগণের ভাগ্যের প্রকৃত উন্নয়ন করা।”
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের এই পুনর্গঠনের কাজকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য এখনো কিছু চক্র ষড়যন্ত্র করছে। আর কোনো অপশক্তি যাতে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে না পারে, সেজন্য দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ থাকতে হবে।
প্রতিশোধ নয়, সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান
নিজের এবং নিজের পরিবারের ওপর হওয়া দীর্ঘ ১৭ বছরের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তাদের ওপর যে অন্যায়-জুলুম চালানো হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
তিনি বলেন, “আমি যদি আজ আমার মাকে (বেগম খালেদা জিয়া) জিজ্ঞেস করতাম মা, আপনার ওপর ১৭ বছর যে অন্যায়-জুলুম এবং মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে, আমরা কি এখন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেব? আমার মা নির্দ্বিধায় বলতেন না বাবা, প্রতিহিংসা নয়, তোমার মূল দায়িত্ব হলো দেশের সবাইকে সাথে নিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।”
তিনি আরও জানান, একই প্রশ্ন যদি তিনি তাঁর প্রয়াত ভাই বা সহকর্মীদের করতেন, তারাও একই উত্তর দিতেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৭ বছর আগে রাজনীতির মাঠে যাদের তিনি সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন, তাদের অনেককেই আজ হারাতে হয়েছে। অনেকে চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এই শারীরিক ও মানসিক কষ্ট তিনি নিজেও প্রতিদিন অনুভব করেন। কিন্তু দেশের স্বার্থে, জনগণের শান্তির স্বার্থে সমস্ত ক্ষোভ ভুলে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চান তিনি।
নতুন বাংলাদেশ গঠনে তরুণদের ভূমিকা
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষ অংশে দেশের তরুণ সমাজ ও ছাত্র জনতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, তরুণরাই হলো দেশের মূল চালিকাশক্তি। ৫ আগস্ট তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছে যে, তারা চাইলে যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।
নতুন সরকার তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী দেশের সব রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানান, যেন সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরকারকে সহযোগিতা করেন, যাতে একটি সুখী, সমৃদ্ধ এবং শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।








