জীবনের পুরো সঞ্চয় আর ঘাম ঝরানো উপার্জনে গড়া একটি বাড়ি। যেখানে জড়িয়ে থাকে সন্তানের শৈশবের স্মৃতি আর পরিবারের নানা গল্প। বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে বাবা-মা যখন সেই সাধের সম্পত্তিটি সন্তানের নামে লিখে দিতে চান, তখন মনের অজান্তেই একটি ভয় কাজ করে “সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর যদি নিজের ঘরেই নিজের জায়গা না থাকে?”
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বহু পরিবারের জন্য এটি একটি অত্যন্ত পরিচিত ও করুণ বাস্তবতা। তবে এই আশঙ্কার অবসান ঘটাতে এবার বড় ধরনের আইনি সুরক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এখন থেকে সম্পত্তি দান করার পরও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা ব্যবহার ও ভোগদখল করার আইনি অধিকার রক্ষা করা যাবে।
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬ কী?
গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। প্রস্তাবিত এই আইনটির মূল লক্ষ্য হলো, প্রবীণ বাবা-মা বা নিকটাত্মীয়রা যেন সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দিয়ে নিজেরা আবাসন বা জীবনযাপনের নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন।
বর্তমানে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে দাতা তার জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগাধিকার নিজের কাছে রেখে দান করার কোনো স্পষ্ট বিধান ছিল না। নতুন এই সংশোধনীর মাধ্যমে আইনে ১২২ক এবং ১২২খ নামে দুটি নতুন ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন আইনের মূল বৈশিষ্ট্য ও সুবিধা
প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে দেশের প্রতিটি পরিবারের জন্যই একটি মানবিক ও শক্তিশালী আইনি নিরাপত্তা বলয় তৈরি হবে। নিচে এই আইনের প্রধান দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
১. আজীবন ভোগদখলের আইনি স্বীকৃতি
নতুন আইনের অধীনে কোনো বাবা-মা যদি তাদের বাড়ি বা জমি সন্তানের নামে দান (Gift) করেন এবং দলিলে শর্ত উল্লেখ থাকে, তবে জীবিত থাকা পর্যন্ত তারা সেই সম্পত্তিতে বসবাস ও তা ভোগদখল করতে পারবেন। মালিকানা হস্তান্তর হলেও তাদের অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
২. রক্তের সম্পর্ক ও স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য
এই বিধানটি নির্দিষ্ট কিছু সম্পর্কের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে:
- বাবা-মা এবং সন্তান বা নাতি-নাতনি।
- নাতি-নাতনি এবং দাদা-দাদি বা নানা-নানি।
- স্বামী ও স্ত্রী।
৩. গ্রহীতার মৃত্যু হলেও বাবা-মায়ের অধিকার সুরক্ষিত
ধরা যাক, একজন বাবা তার বাড়িটি সন্তানের নামে লিখে দিলেন। দুর্ভাগ্যবশত বাবা জীবিত থাকা অবস্থাতেই যদি সেই সন্তানের মৃত্যু হয়, তবে সম্পত্তির মালিকানা সন্তানের উত্তরাধিকারীদের কাছে চলে যাবে। কিন্তু বাবার সেই বাড়িতে আজীবন থাকার বা ভোগদখল করার অধিকারে কোনো প্রভাব পড়বে না।
৪. বিশেষ প্রয়োজনে চুক্তি পরিবর্তনের সুযোগ
যদি কখনও পরিবারে জরুরি আর্থিক সংকট, চিকিৎসা বা শিক্ষার প্রয়োজনে সম্পত্তি বিক্রি বা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করতে হয়, তবে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে শর্ত পরিবর্তন করা যাবে। যদি কোনো পক্ষ মানসিক অসুস্থ বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, সে ক্ষেত্রে জেলা জজের অনুমতি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
অন্যান্য দান বা হেবা ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব
অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠতে পারে, এই নতুন আইনের ফলে আমাদের প্রচলিত মুসলিম আইনের ‘হেবা’ বা সাধারণ দান ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে কিনা।
সরকার স্পষ্ট করেছে যে, এই প্রস্তাবিত আইন প্রচলিত কোনো দান বা মুসলিম আইনের হেবা ব্যবস্থাকে বাতিল বা সীমিত করবে না। এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি নতুন ও স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে যুক্ত হবে এবং সব ধর্মের মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।
প্রবীণদের মানবিক নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত
সম্পত্তি কেবল ইট-পাথরের দেয়াল বা কিছু টাকার হিসাব নয়; এটি মানুষের শেষ বয়সের একমাত্র আশ্রয়। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন কোনো বাবা-মাকে বৃদ্ধ বয়সে নিজের বাড়ি থেকেই উৎখাত হতে না হয়, সেই মানবিক দিকটিকে কেন্দ্র করেই এই আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানে বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হলে বাংলাদেশে সম্পত্তি হস্তান্তরের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। উত্তরসূরিরা সম্পত্তি পাবে ঠিকই, কিন্তু বাবা-মায়ের শেষ বয়সের মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকবে শতভাগ সুরক্ষিত।








