আমাদের মানবদেহের সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করে সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গ ‘মস্তিষ্ক’। এটি যদি সুস্থ থাকে, তবে পুরো শরীর সঠিকভাবে পরিচালিত হয়। তবে বর্তমান যুগে অনিয়মিত জীবনযাপন, পুষ্টির অভাব, মানসিক চাপ এবং পরিবেশদূষণের কারণে মস্তিষ্কের নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
আগে ধারণা করা হতো মস্তিষ্কের রোগ কেবল বয়স্কদেরই হয়। কিন্তু সত্য হলো, যেকোনো বয়সের মানুষই এখন এসব রোগে আক্রান্ত হতে পারেন, যদিও ৪০ বছর পার হওয়ার পর এই ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় লক্ষণগুলো চিনে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারলে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো সম্ভব। চলুন জেনে নিই মস্তিষ্কের ৫টি জটিল রোগ, এদের লক্ষণ ও কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত।
১. ব্রেন স্ট্রোক (Brain Stroke)
মস্তিষ্কের রোগের কথা উঠলেই সবার আগে ব্রেন স্ট্রোকের নাম আসে। মস্তিষ্কের কোনো স্থানে রক্ত চলাচল হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা কোনো রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে তাকে ব্রেন স্ট্রোক বলা হয়। রক্ত পৌঁছাতে না পারলে অক্সিজেনের অভাবে ব্রেনের স্নায়ু ও কোষগুলো খুব দ্রুত মারা যেতে থাকে।
ব্রেন স্ট্রোকের প্রধান কারণসমূহ
- অতিরিক্ত অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস।
- রক্তে অতিরিক্ত পরিমাণে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল থাকা।
- অতিরিক্ত ধূমপান, স্থূলতা এবং অতিরিক্ত মানসিক উদ্বেগ বা স্ট্রেস।
- হৃদরোগের সমস্যা থাকা, বিশেষ করে আর্টেরিয়াল ফাইব্রিলেশন যা মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধাতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন
হঠাৎ হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া, শরীরের যেকোনো এক পাশ সম্পূর্ণ প্যারালাইজড বা অবশ হওয়া এবং কথা বলতে গিয়ে শব্দ জড়িয়ে যাওয়া বা অসংলগ্ন কথা বলা।
২. ব্রেন ক্যানসার ও টিউমার (Brain Cancer & Tumor)
অনেকের ধারণা ব্রেন টিউমার মানেই ক্যানসার কিংবা নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। সময়মতো সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা নিলে অনেক ক্ষেত্রে ব্রেন ক্যানসার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
মস্তিষ্কের বিশেষ ধরনের টিউমার যা ‘গ্লায়োমা’ নামে পরিচিত, মূলত এটিকেই ব্রেন ক্যানসার বলা হয়ে থাকে। এটি মস্তিষ্কের যেকোনো অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখলে নিউরোসার্জনের পরামর্শ নেবেন
যদি দীর্ঘদিন ধরে প্রচণ্ড মাথাব্যথা থাকে, ঘন ঘন খিঁচুনি দেখা দেয় কিংবা হঠাৎ কানে শোনার ক্ষমতা বা শ্রবণশক্তি কমে যেতে শুরু করে, তবে বিন্দুমাত্র দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
৩. মেনিনজাইটিস (Meningitis)
আমাদের মস্তিষ্ককে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্য এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহের জন্য এর চারপাশে একটি স্বচ্ছ পাতলা সুরক্ষামূলক আবরণ থাকে, যাকে বলা হয় ‘মেনিনজেস’। কোনো কারণে যখন এই আবরণে ইনফেকশন বা সংক্রমণ ঘটে এবং প্রদাহের সৃষ্টি হয়, তখন তাকে মেনিনজাইটিস বলা হয়।
রোগের কারণ ও ঝুঁকি
ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক কিংবা ক্ষতিকর পরজীবীর আক্রমণে এই রোগ হতে পারে। ইনফেকশন ব্রেনে পৌঁছালে খুব দ্রুত স্নায়ুকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাধারণ লক্ষণসমূহ
তীব্র মাথা ঘোরা, ঘন ঘন বমিভাব বা বমি হওয়া এবং মাইগ্রেনের মতো প্রচণ্ড মাথাব্যথা হওয়া। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে রোগী মারাত্মক স্নায়বিক জটিলতায় ভুগতে পারেন এবং এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
৪. পারকিনসন রোগ (Parkinson’s Disease)
অতীতে পারকিনসন রোগকে শুধু বৃদ্ধ বয়সের রোগ হিসেবে ভাবা হলেও, বর্তমানে তুলনামূলক কম বয়সী তরুণদের মধ্যেও এই রোগ ধরা পড়ছে। এই রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে বিশ্বজুড়ে এখনো গবেষণা চলছে।
সম্ভাব্য কারণ
গবেষকদের মতে অতিরিক্ত পরিবেশদূষণ, আমাদের খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি এবং বংশগত ধারার কারণে পারকিনসনের ঝুঁকি বাড়ছে।
কীভাবে ক্ষতি করে?
এই রোগে আক্রান্ত হলে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা নিউরন ধীরে ধীরে শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ব্রেন তার স্বাভাবিক কাজের নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং রোগীর হাত-পা কাঁপা শুরু হয়। ধীরে ধীরে রোগী নিজের শরীরের নড়াচড়া ও স্বাভাবিক চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি হারিয়ে ফেলেন।
৫. মৃগী রোগ (Epilepsy)
মৃগী হলো স্নায়ুতন্ত্রের একটি বিশেষ জটিল রোগ। যেকোনো বয়সে এটি হতে পারে নবজাতক শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক ব্যক্তি পর্যন্ত।
মৃগী রোগের কারণ
অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি জিনগত বা বংশগত কারণে হয়ে থাকে। তবে মাথায় কোনো গুরুতর বা মারাত্মক আঘাত পেলে, কিংবা ব্রেনের গঠনগত কোনো বড় ত্রুটি থাকলেও মৃগী রোগের সৃষ্টি হতে পারে।
রোগের মেকানিজম ও পরীক্ষা
আমাদের মস্তিষ্কে থাকা সূক্ষ্ম স্নায়ুগুলো শরীরের সব অঙ্গকে সংকেত পাঠায়। এই স্নায়বিক সার্কিটে যখন হঠাৎ অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক সংকেত বা ‘স্পার্কিং’ তৈরি হয়, তখনই রোগী খিঁচুনি দিয়ে হাত-পা শক্ত করে ফেলেন। রোগের তীব্রতা পরিমাপ করার জন্য চিকিৎসকেরা সাধারণত এমআরআই (MRI) এবং ইইজি (EEG) পরীক্ষা করিয়ে থাকেন এবং সে অনুযায়ী টানা ওষুধ দিয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
মস্তিষ্কের যেকোনো সমস্যাই জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। তাই নিচে উল্লেখিত লক্ষণগুলো দেখা মাত্রই কোনোপ্রকার ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর ভরসা না করে দ্রুত নিউরোলজিস্ট বা নিউরোসার্জনের কাছে যাওয়া উচিত:
১. হঠাৎ করে তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে যা আগে কখনো হয়নি।
২. কথা বলতে সমস্যা হলে বা কথা জড়িয়ে গেলে।
৩. চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া বা হঠাৎ কানে কম শুনলে।
৪. শরীরের কোনো এক পাশ দুর্বল বা অবশ মনে হলে।
৫. হঠাৎ করে খিঁচুনি উঠলে বা অজ্ঞান হয়ে গেলে।
মস্তিষ্কের জটিল রোগগুলো এড়িয়ে চলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা। সময়মতো ঘুমানো, মানসিক চাপ কমানো, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সুস্থ থাকুন, নিজের শরীরের সামান্যতম অসঙ্গতিকেও অবহেলা করবেন না।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো শেয়ার করে আপনার প্রিয়জনদেরও মস্তিষ্কের রোগ সম্পর্কে সচেতন করে তুলুন।








