তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (LNG) টার্মিনালে হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সারা দেশে এক ভয়াবহ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে হঠাৎ করেই বিপুল পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানার উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের গৃহস্থালি জীবনের ওপর।
হঠাৎ করে জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প খাত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, টার্মিনাল দ্রুত মেরামত করে চালু করা হলেও পরিস্থিতি একদম স্বাভাবিক হতে অন্তত কয়েক দিন সময় লেগে যেতে পারে।
মূল সমস্যা কোথায় এবং কীভাবে শুরু হলো?
সরকারি সূত্রের তথ্যমতে, মার্কিন মহাকাশ ও জ্বালানি সংক্রান্ত কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালনাধীন ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ (FSRU)-তে হঠাৎ প্রযুক্তিগত বা যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়।
- সরবরাহে ঘাটতি: সাধারণ সময়ে দেশে প্রতিদিন প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (FSRU) মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আসে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট।
- হঠাৎ সরবরাহ হ্রাস: একটি টার্মিনাল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক ধাক্কায় প্রতিদিন ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের জোগান কমে গেছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, দ্রুততার সঙ্গে মেরামত কাজ চালানো হচ্ছে এবং বুধবার সকালের মধ্যে এফএসআরইউটি পুনরায় চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তিতাস গ্যাস কোম্পানির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, পাইপলাইনে জমে থাকা জমে থাকা গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় আসল সংকট দেখা দিচ্ছে এখন। টার্মিনাল চালু হলেও শুক্রবারের আগে পরিস্থিতির শতভাগ উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশাল ধস ও লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা
গ্যাস সরবরাহে এই বিরাট ঘাটতির সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে বিদ্যুৎ খাতে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম পাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমাতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
১. গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অবস্থা
গ্যাস বরাদ্দে এই কাটছাঁটের কারণে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন এক লাফে ১,৪০০ মেগাওয়াট থেকে ১,৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমে গেছে।
২. রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ
সংকটের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া। যান্ত্রিক জটিলতার কারণে মঙ্গলবার এই কেন্দ্রটি থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কমে গেছে।
সব মিলিয়ে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে। বর্ষার বৃষ্টির কারণে দেশজুড়ে বিদ্যুতের সার্বিক চাহিদা তুলনামূলক কম থাকা সত্ত্বেও, রাতভর সারা দেশে ২৫০ মেগাওয়াটেরও বেশি লোডশেডিং মেটাতে হয়েছে।
থমকে গেছে শিল্প-কারখানা, বাসাবাড়িতে হাহাকার
গ্যাস সংকটের জাঁতাকলে পড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের উদীয়মান শিল্প খাত ও সাধারণ গ্রাহকরা।
- শিল্প উৎপাদনে ধস: আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ বা প্রেসার মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এতে তৈরি পোশাকসহ নানা শিল্প-কারখানার ভারী যন্ত্রপাতি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কারখানাগুলোর দৈনিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
- বাসাবাড়িতে দুর্ভোগ: তিতাস গ্যাস সরবরাহ এলাকার বিশেষ করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বাসাবাড়ির চুলায় গ্যাস থাকছে না। দুপুরের রান্না ও দৈনন্দিন কাজে গৃহিণীরা মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েছেন।
- সিএনজি স্টেশনে লম্বা লাইন: সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের প্রেসার নেমে গেছে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। ফলে যানবাহনে গ্যাস নিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের।
৩০ জুলাই থেকে সারা দেশে সিএনজি স্টেশন বন্ধের ডাক
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই সাধারণ মানুষের চাপ বাড়াতে পারে সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিকদের নতুন কর্মসূচি। সিএনজি বিক্রিতে কমিশন বাড়ানোর দাবিতে আগামী ৩০ জুলাই ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সারা দেশে সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
সংগঠনটির নেতারা এক সংবাদ সম্মেলনে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে যদি সরকার তাদের দাবি না মানে, তবে আগামী ২৩ আগস্ট থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হবে।
সিএনজি মালিকদের দাবি কী?
- কমিশন বৃদ্ধির দাবি: ২০১৫ সালে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে কমিশন নির্ধারিত ছিল ৮ টাকা। গত ১১ বছরে মূল্যস্ফীতি, কর্মীদের বেতন, যন্ত্রাংশ ও লাইসেন্স ফি বহুগুণ বাড়ায় কমিশন বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা (অর্থাৎ ঘনমিটারে ৫ টাকা ৯৬ পয়সা বৃদ্ধি) করার দাবি জানাচ্ছেন তারা।
- স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়: ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে কমিশন যেন স্বয়ংসক্রিয়ভাবে বাড়ে, সেই বিধান রাখার দাবি তোলা হয়েছে।
হঠাৎ এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়া আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্রকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই কারিগরি ত্রুটি সমাধান করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে দেশের অর্থনীতি ও শিল্প খাত বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে অনতিবিলম্বে পেট্রোবাংলা ও বিদ্যুৎ বিভাগকে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।








