বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ হাজার বিদেশি নাগরিক সরকারি হিসাবে অবস্থান করছেন। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি এসেছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। তথ্যমতে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সাড়ে আট হাজার ভারতীয় নাগরিক সম্পূর্ণ অবৈধভাবে অবস্থান করছেন এবং বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে বাস্তব চিত্র সরকারি এই হিসেবের চেয়েও অনেক বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাংলাদেশে থেকে যাওয়া এবং ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া চাকরি করা এখন দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিগত সরকারের আমলে ট্যুরিস্ট বা বিজনেস ভিসায় এসে এ দেশে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
যেভাবে অবৈধভাবে থাকছেন ভারতীয় নাগরিকরা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতীয় নাগরিকরা মূলত দুটি বিশেষ উপায়ে বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন:
- ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া: অধিকাংশ ভারতীয় নাগরিক বৈধ ট্যুরিস্ট, বিজনেস বা অন-অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা নিজ দেশে ফিরে যান না।
- ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া চাকরি: তৈরি পোশাক খাত, টেক্সটাইল, বায়িং হাউজ, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাত এবং বিভিন্ন এনজিওতে বহু ভারতীয় নাগরিক কাজ করছেন। এদের অনেকেরই কোনো বৈধ ওয়ার্ক পারমিট বা আয়কর দেওয়ার নথি নেই।
দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বড় আঘাত
অবৈধ ভারতীয় নাগরিকদের কারণে বাংলাদেশ প্রধানত তিনটি বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে:
১. রিজার্ভে চাপ ও রাজস্ব ক্ষতি
বৈধ ওয়ার্ক পারমিট না থাকায় এই বিদেশি নাগরিকরা সরকারকে কোনো ট্যাক্স বা আয়কর দেন না। ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। উপরন্তু, তারা উপার্জিত টাকা হুন্ডি বা বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে ভারতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
২. দেশের যুবসমাজের চাকরির সুযোগ নষ্ট
বাংলাদেশের শিক্ষিত ও দক্ষ যুবসমাজ যখন উচ্চপদস্থ চাকরির জন্য দিনরাত লড়াই করছে, তখন দেশের টেক্সটাইল ও করপোরেট খাতের অনেক শীর্ষ পদ এই অবৈধ ভারতীয় নাগরিকদের দখলে চলে যাচ্ছে।
৩. অপরাধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বসবাসকারী এসব নাগরিকদের অনেকে বিভিন্ন সময় জালিয়াতি এবং আর্থিক প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ছেন। কোনো কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং সিস্টেম না থাকায় অপরাধ করার পর এদের চিহ্নিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
কোন সেক্টরে কত শতাংশ ভারতীয় কাজ করছেন?
বাংলাদেশে অবৈধভাবে কর্মরত ভারতীয়দের একটি বড় অংশই দেশের তৈরি পোশাক খাতের সাথে যুক্ত। এক নজরে দেখে নিন কোন খাতে তাদের উপস্থিতি কতটুকু:
| সেক্টরের নাম | কর্মরত ভারতীয়দের হার | কাজের ধরণ ও এলাকা |
| তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল | ৫০ ভাগের বেশি | সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ডাইং, ওভেন ও নিটওয়্যার ফ্যাক্টরিতে মার্চেন্ডাইজার, ইঞ্জিনিয়ার বা ফ্লোর ম্যানেজার হিসেবে। |
| বায়িং হাউজ | ১৫ থেকে ২০ ভাগ | ঢাকা ও চট্টগ্রামের ছোট-বড় বায়িং হাউজে বায়ারদের সাথে যোগাযোগ ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল। |
| করপোরেট ও ভোগ্যপণ্য খাত | ১০ ও ১২ ভাগ | দেশের বড় বেসরকারি গ্রুপ অব কোম্পানিজে মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা। |
| তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাত | ৫ থেকে ৮ ভাগ | দ্রুত বর্ধনশীল আইটি সেক্টরে টেকনিশিয়ান হিসেবে। |
| বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) | ৩ থেকে ৫ ভাগ | বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থায় পরামর্শক বা কনসালট্যান্ট হিসেবে। |
পুশইন ও ঢাকা-দিল্লি চিঠি চালাচালি
ভারত থেকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইনের (অবৈধভাবে লোক ঠেলে দেওয়া) চেষ্টা করা হলেও ঢাকা সেই পথে হাঁটছে না। বাংলাদেশ চায় নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি উপায়ে অবৈধ ভারতীয়দের ফেরত পাঠাতে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ভারতকে বেশ কয়েকটি চিঠি দিলেও ভারত তাতে তেমন সাড়া দিচ্ছে না। উল্টো সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটানোর প্রক্রিয়া চালু রেখেছে তারা।
অবৈধদের তাড়াতে ও আশ্রয়দাতাদের ধরতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ বিদেশিদের ঠেকাতে এবার ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) মিলে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির কাজ শুরু করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং এসবির দেওয়া তালিকা অনুযায়ী অবৈধ বিদেশিদের সবার নাম-পরিচয় চাওয়া হয়েছে। নাম-পরিচয় পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা করা হবে।
একই সাথে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শুধু অবৈধ বিদেশি নাগরিকরাই নয়, বরং যেসব পোশাক কারখানা, বায়িং হাউজ বা করপোরেট প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া এদের চাকরি দিয়েছে এবং আশ্রয় দিয়েছে, তাদেরও কঠোর আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া স্বল্পমেয়াদি ভিসায় এসে যেন কেউ চাকরি করতে না পারে, সেজন্য কঠোর ভিসা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।








