আমাদের সমাজে চাচাতো, খালাতো, ফুফাতো বা মামাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ের প্রচলন বেশ পুরোনো। অনেকে মনে করেন, চেনা-জানা পরিবারের মধ্যে বিয়ে হলে সম্পর্ক ভালো থাকে, পারিবারিক সম্পদ বাইরে যায় না এবং সামাজিক ঐতিহ্য বজায় থাকে। তবে সময়ের সাথে সাথে এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এই ধারণার পেছনে থাকা বড় এক স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা সামনে আসছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, খুব ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বা ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ের ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জিনগত সমস্যার কারণে সন্তানরা বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে আসতে পারে। তাই জীবনসঙ্গী নির্বাচনের আগে এই বিষয়ে সচেতন হওয়া এখন সময়ের দাবি।
কেন আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে ক্ষতিকারক? (জেনেটিক কারণ)
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের সবচেয়ে বড় ক্ষতিকারক দিক হলো জেনেটিক বা জিনগত সমস্যা। মানুষের শরীরে হাজার হাজার জিন থাকে। বাবা-মা উভয়ের কাছ থেকে জিন পেয়েই একটি শিশু বড় হয়।
- ত্রুটিপূর্ণ জিনের মিলন: মানুষের শরীরে কিছু সুপ্ত বা গোপন ত্রুটিপূর্ণ জিন থাকতে পারে। যখন দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবারের মানুষ বিয়ে করেন, তখন তাদের জিনের মিল না থাকায় এই ত্রুটিপূর্ণ জিনগুলো সন্তানের শরীরে প্রকাশ পায় না।
- রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি: কিন্তু যখন চাচাতো বা খালাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে হয়, তখন তাদের বংশগত কারণে জিনের মধ্যে অনেক বেশি মিল থাকে। ফলে বাবা ও মা উভয়ের শরীরেই যদি একই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ জিন থাকে, তবে তা সন্তানের শরীরে প্রবেশ করে রোগ হিসেবে প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ হয়ে যায়।
গবেষণার চোখে আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের ক্ষতিকারক দিক
যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ডে পরিচালিত ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ নামে একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় প্রায় ১৩ হাজার শিশুর স্বাস্থ্য ও শারীরিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এই গবেষণায় আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের কিছু স্পষ্ট ক্ষতিকর দিক উঠে এসেছে:
১. জন্মগত ত্রুটির দ্বিগুণ ঝুঁকি
সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বা রক্তের সম্পর্কহীন দম্পতির সন্তানের মধ্যে জন্মগত স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে প্রায় ৩ শতাংশ। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বা কাজিনদের মধ্যে বিয়ের ফলে সন্তানদের ক্ষেত্রে এই জন্মগত রোগ বা ত্রুটির ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়ে ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
২. ভাষাগত ও মানসিক বিকাশে বাধা
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কাজিন দম্পতির সন্তানদের মধ্যে ভাষাগত বিকাশে (কথা বলতে শেখা) কিছুটা বেশি সমস্যা দেখা যায়। বয়স অনুযায়ী শিশুর যে মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তন বা বিকাশ হওয়ার কথা, তা অন্যান্য সাধারণ শিশুদের তুলনায় ধীরগতির হয়।
৩. অতিরিক্ত চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন
এই ধরনের শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হতে পারে বা তারা বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। ফলে সাধারণ শিশুদের তুলনায় তাদের অনেক বেশি ডাক্তার এবং চিকিৎসা সেবা নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।
আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে এবং সাধারণ দম্পতির সন্তানের ঝুঁকির তুলনা
সহজে বিষয়টি বোঝার জন্য নিচে একটি তুলনামূলক টেবিল দেওয়া হলো:
| বিষয় | সাধারণ দম্পতির সন্তান | আত্মীয় বা কাজিন দম্পতির সন্তান |
| জন্মগত রোগ বা ত্রুটির ঝুঁকি | প্রায় ৩ শতাংশ (কম ঝুঁকি) | প্রায় ৬ শতাংশ (দ্বিগুণ ঝুঁকি) |
| জিনগত মিলের হার | অনেক কম | অনেক বেশি (ত্রুটিপূর্ণ জিনের ঝুঁকি বেশি) |
| শারীরিক ও মানসিক বিকাশ | সাধারণত স্বাভাবিক ও সময়মতো হয় | কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিকাশ ধীরগতির হয় |
| চিকিৎসা সেবার প্রয়োজনীয়তা | স্বাভাবিক মাত্রায় | তুলনামূলকভাবে বেশি প্রয়োজন হয় |
বিশ্বজুড়ে আইনি কড়াকড়ি ও নিষেধাজ্ঞা
আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের এই ক্ষতিকারক দিকগুলো বিবেচনা করে বিশ্বের অনেক দেশ এখন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
- ইউরোপের অবস্থান: ইউরোপের দেশ নরওয়ে ইতোমধ্যে কাজিনদের মধ্যে বিয়ে আইন করে নিষিদ্ধ করেছে।
- সুইডেনের উদ্যোগ: সুইডেনও নরওয়ের মতো একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আনার জন্য আইন প্রণয়নের কাজ করছে।
- যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপ: যুক্তরাজ্য সরাসরি নিষিদ্ধ না করলেও, বিয়ের আগে বা সন্তান নেওয়ার আগে জেনেটিক কাউন্সেলিং বা জিনগত পরামর্শ নেওয়ার ওপর ব্যাপক জোর দিচ্ছে। এর মাধ্যমে দম্পতিরা আগে থেকেই জানতে পারেন তাদের সন্তানের কোনো ঝুঁকি আছে কিনা।
এন্ডোগামি বা একই গোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ের প্রভাব
গবেষকরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন, যা আমাদের জানা দরকার। একে বলা হয় ‘এন্ডোগামি’। রক্তের সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও যদি একটি নির্দিষ্ট ছোট গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মানুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের মধ্যেই বিয়ে শাদী সম্পন্ন করে, তবে তাদের মধ্যেও জিনগত মিল তৈরি হয়ে যায়। এর ফলেও রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই সন্তানদের মধ্যে একই ধরনের জিনগত স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি ও আমাদের করণীয়
বর্তমান যুগের তরুণ-তরুণীদের চিন্তাভাবনায় কিন্তু বড় পরিবর্তন আসছে। শিক্ষা, ইন্টারনেট এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে অনেকেই এখন পারিবারিক পছন্দের চেয়ে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ, মানসিক মিল এবং স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলোকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।
অবশ্য গবেষকরা এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হলেই সব সন্তান অসুস্থ হবে—এমনটি নয়। অনেকেই সম্পূর্ণ সুস্থ জীবনযাপন করে। তবে যেহেতু ঝুঁকিটা দ্বিগুণ, তাই সচেতন থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।
যদি কোনো পরিবারে আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের কথা বার্তা চলে, তবে সবচেয়ে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হবে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। বিয়ের আগে বা সন্তান নেওয়ার আগে রক্তের পরীক্ষা এবং জেনেটিক কাউন্সেলিং করিয়ে নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনেক বড় বড় রোগ ও শারীরিক কষ্ট থেকে রক্ষা করা সম্ভব।








